যাকাতের শাড়ি….

শেখ সাফওয়ানা জেরিন

হাসান সাহেব প্রচুর টাকার মালিক। বসুন্ধরায়২ টা ইলেক্ট্রনিক্স শপ থেকে মাসে আয় হয় ৫০ লাখ টাকা। সদরঘাটে একটা চিনির আর একটা বরফের কল আছে তার। এছাড়াও কার্পেট এর ব্যাবসা আছে, মিরপুরে তার নিজের একটা বিশাল রেস্টুরেন্ট আছে। সব মিলিয়ে মাসে কয়েক কোটি টাকা আয় তার।
কিন্তু বড়লোক হলেও তিনি দান খয়রাত তেমন করেননা । তার অবশ্য নিজের কিছু যুক্তি আছে এই বিষয়ে। প্রথমত তিনি মনে করেন তিনি এই সম্পদ কষ্ট করে উপার্জন করেছেন তার থেকে এক পয়সাও মানুষকে বিনে কষ্টে দেওয়া ঠিক নয়। দ্বিতীয়ত , তিনি বছরে একবার জাকাত দেন , কিন্তু সদকা করাতো ফরজ নয় তাইনা!
আসুন , দেখে নেই তার জাকাত দেওয়ার ধরণ । হাসান সাহেব যাকাত দেন ২০ টা শাড়ি। তার সম্পদের পরিমাণ, ব্যাংকে কতো টাকা আছে এসব কিছুই তার হিসাবের দরকার হয়না। প্রতি বছর মার্কেট থেকে মিসেস হাসান সবচেয়ে কম দামী, ফ্যারফ্যারা কতো গুলো যাকাত শাড়ি কিনে আনেন।এই দিয়ে তিনি যাকাত দিয়ে দেন। কিন্তু সেই যে এক বছর পরিমাণ সময়ে নিসাব পরিমাণ মালে যে আড়াই শতাংশ হারে যাকাত দিতে হয় তা তারা কিছু মনেই করেন না।
যাকাতের হিসাব নিকাশ ও ঠিক মতো যাকাত দেওয়ার মানসিকতা তৈরি না হওয়ার কারন কি? এর কয়েকটা কারন হতে পারে-
১ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসবাস করার কারনে গরীব দুঃখীর কষ্ট অনুভব করতে না পারার ব্যর্থতা।
২ সম্পদের মালিকানার ধারনায় ভুল। নিজেকে নিজের সম্পদের মালিক ভাবা।
৩ যাকাত ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা গড়ে না তোলা।
৪ রাষ্ট্রীয় ভাবে যাকাত তোলার সুনির্দিষ্ট কঠোর নীতিমালা না থাকা।
৫ রাষ্ট্রীয় ভাবে যাকাত বণ্টনের ব্যাবস্থা না থাকা।
৬ যাকাত কে নিছক ভিক্ষা মনে করা। যেখানে যাকাত শুধু দান ই নয় , ধনীর সম্পদে গরীবের অধিকার ও বটে ।
৭ যাকাতের যোগ্য ব্যক্তিদের সনাক্ত করতে না পারা
৮ যাকাতের জন্য নিম্ন মানের কাপড় কেনা
৯ যাকাতে কিছু শাড়ি লুঙ্গি দিয়ে দ্বায় মুক্ত হওয়া ।

আসলে যাকাত কেন দিতে হবে , আমাদের সমাজের মানুষ তাই বুঝেনা। সকল সম্পদের মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা । পৃথিবীতে তিনি মানুষের ভোগ করার জন্য প্রচুর সম্পদ দিয়েছেন। এরমধ্যে কিছু মানুষ হয়তো বুদ্ধি কিংবা মেধার বলে অধিক সম্পদ উপার্জন করে। কিন্তু তাই বলেই সে সেই সম্পদের যথেচ্ছা ব্যাবহার করতে পারেনা। তাকে অবশ্যই সেই সম্পদ তার প্রকৃত মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী খরচ করতে হবে। শুধু মাত্র এই সম্পদের মালিকানার ধারনায় পরিবর্তন আমাদের সমাজের অর্থনীতির আমুল পরিবর্তন সাধন করতে পারে, রোধ করতে পারে অর্থের অপচয়।
যাকাত সম্পদের মালিকানায় ইসলামী মতবাদের অন্যতম একটা ভিত্তি, যার মাধ্যমে আসলে বুঝা যায় আমরা সম্পদের মালিকানায় আল্লাহ্‌র প্রভুত্ব কতো খানি স্বীকার করছি।
তাই যাকাত দান নয়, ভিক্ষাও নয়। যাকাত হোল ধনীর সম্পদে গরীবের অধিকার।
মন চলে যায় খেলাফায়ে রাশেদিনের সেই যুগে। যখন মানুষ পরিপূর্ণ ভাবে যাকাতের নীতিমালা মেনে চলায় আরবে যাকাত গ্রহণ করার কোন লোক ছিলনা। আজকে সমাজে এতো ক্ষুধা দারিদ্র্য বঞ্চনার কারন কি? কারন একটাই । সেটা হোল যাকাতের নিয়ম কে মনগড়া বানিয়ে যার যার ইচ্ছামতো লুকোচুরি করে যাকাত দেওয়া।
যাকাত ইসলামী অর্থনীতির মেরুদণ্ড । হজরত ওমর (রা) বলেছেন- যখন দিবে , ধনী করে দাও।
এই মর্ম বানী আজ কেউ বুঝেনা।
ঈদের সময় আসলে যাকাতের কিছু নিম্ন মানের শাড়ি বিতরণ করেই আমাদের দায়িত্ত শেষ করি । কিন্তু আসলেকি এভাবে যাকাত দিতে হয়? যাকাত দিতে হবে এমন ভাবে এমন ব্যক্তিকে যাতে তার আর পরবর্তীতে যাকাত না নেওয়া লাগে, যাতে সে এই যাকাতের অর্থ দিয়ে কিছু করে খেতে পারে, তার নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুঃস্থ মহিলাদের সেলাই মেশিন দেওয়া, তাদের প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা করা, ছেলেদের কে ছোট মুদির দোকান করে দেওয়া কিংবা রিকশা কিনে দেওয়া, মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের পড়ালেখার জন্য নগদ অর্থ দেওয়া , তাদের জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ছাড়াও আরও অনেক ভাবেই যাকাতের যোগ্য ব্যক্তিদের যাকাত দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
কিন্তু একবার ভেবে দেখুন , যাকাতের ওই নিম্ন মানের কিছু শাড়ি দিয়ে অভাবী দুঃস্থ মানুষগুলোর কতো টা উপকার হয়? মাস ঘুরতে না ঘুরতেই ওইসব শাড়ি ছিঁড়ে যায়। আর তারাও গালি দেয় মনে মনে এই ভেবে যে যাকাতের শাড়ি বলেই এগুলোর এই দশা। কিন্তু , তারা কি আমাদের ভাই বোন নয়? তাহলে আমরা নিজেদের জন্য যে কাপড় পড়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা তা তাদের কীভাবে দেই?
আর সবচেয়ে বড় কথা হোল কোন রকম হিসাব নিকাশ ছাড়াই গণহারে যাকাতের শাড়ি দিয়ে দিলেই যাকাত আদায় হয়ে যায়না। যাকাতের মূল উদ্দেশ্য হোল দারিদ্র্য বিমোচন করা। সমাজ থেকে ক্ষুধা দারিদ্র্যকে চিরতরে নির্বাসন দিতেই যাকাতের আবেদন।
তাই তো আমাদের চেতনার কবি আহ্বান করেছিলেন –
ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে,
তৃষ্ণাতুরের ও ভাগ আছে ও পেয়ালাতে।
ভোগীদের উদ্বৃত্ত অন্নে আছে অধিকার ,
এই পৃথিবীতে ক্ষুধিতের , এ যেন আল্লাহ্‌র ফরমান।
মোরা শুধু জানি , যার ঘরে ধন রত্ন জমানো আছে
ঈদ আসিয়াছে , যাকাত আদায় করিব তাদের কাছে ।
যক্ষের মতো লক্ষ লক্ষ টাকা জমাইয়া যারা ,
খোদার সৃষ্ট কাঙ্গালে যাকাত দেয়না , মরিবে তারা ।
ইহা আমাদের ক্রোধ নয় , ইহা আল্লাহ্‌র অভিশাপ,
অর্থের নামে জমেছে তোমার ব্যাংকে বিপুল পাপ।
মন খুলে আজ দাও যাকাত
করোনা হিসাব , হিসাবী হৃদয়ের অঙ্কপাত।

Advertisements
By মুহাম্মাদ শহিদুল ইসলাম Posted in গল্প

সব মেয়েকেই আপনি দামী শাড়ি ডায়মন্ডের নেকলেস দিয়ে খুশী করতে পারবেন না…..

শেখ সাফওয়ানা জেরিন

সব মেয়েকেই আপনি দামী শাড়ি ডায়মন্ডের নেকলেস দিয়ে খুশী করতে পারবেন না। পৃথিবীতে এখনো এমন অনেক মেয়ে আছে যারা শুধু ভালোবাসার মায়ায় বছরের পর এক ছাদের নীচে জোড়া তালি দেওয়া কাপড় পড়েও সুখে আছে। এসব মেয়েরা দামী শাড়ি গহনা চায় না, কিন্তু তার চেয়েও দামী একটা জিনিষ চায়। সেটা হল- গভীর ভালোবাসা, যার সাথে শাড়ি গহনার কোন তুলনা হয়না। স্বামীর প্রয়োজনে তাদের গলার মালাটা খুলে নিলেও মনে কষ্ট পায় না, কিন্তু অকারণে আপনার বলা একটি কঠোর কথায় তাদের পায়ের নীচের জমিন টলে ওঠে। হ্যা। হয়তো আপনাদের কাছে এসব কিছুই না।আর অনুভূতিপ্রবণ মানুষরা খালি কলসি ও না, যে বেশী বেজে বেজে বলবে আমার অনেক দুঃখ আছে। এদের দুঃখরা সন্ধ্যা তারার সাথে কথা বলে, এদের চোখের পানি শুধু এদের ছায়া আর সৃষ্টিকর্তাই দেখে।
বোকা মেয়েরা ভালোবাসা নিয়ে মাথায় ঘামায় না। এই জন্যই হুমায়ন আহমেদ লেখেছেন বোকা মেয়েরাই নাকি সুখী।
মাথার উপরে ছাদ, মাস শেষে চাইনিজে খাওয়া, ভালো কাপড় পড়তে পেরে পড়শির কাছে গল্প করতে পেরেই অনেকে সন্তুষ্ট চিত্তে দিন যাপন করে। স্বামীর অনুভূতি নিয়ে বোকারা মাথা ঘামায় না।কিংবা ভ্রুকুটি, অবহেলা নিয়েও চিন্তা করার সময় তাদের নেই সিরিয়ালের ফাঁকে ফাঁকে। স্বামী কই গেলো, কোথায় ঘুমাল, কার দিকে তাকাল এসব নিয়ে কেয়ার করার ফুরসত তাদের কই? আর অনুভূতিপ্রবণ নারী মাত্রই স্বামীর ব্যাপারে ঈর্ষাপ্রবণ। অন্য নারীর সাথে ভাগ না করতে চাইলে যদি হিংসুক বলেন, এই হিংসা করার অধিকার কী তার নেই? তার তো নিজের স্বামীকে অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়ার কথা না। এটাও ভালোবাসার একটা প্রকাশ।
আর যে নারী নিজের স্বামীকে ভাগ করে নিতে পারবে সে নিজেও যে নিজেকে অন্যের সাথে ভাগ করে দিতে পারে, সেটা বুঝতে কী খুব বেশী বুদ্ধির দরকার আছে। যে ছাড় দেয় সে ছাড় নেয় ও।
অনুভূতিপ্রবণ মেয়েগুলোরই যতো সমস্যা । শাড়ি গহনা না দিলেও কষ্ট নেই এদের কিন্তু একটা স্বার্থপরতার আচরণ নিমিষেই এই মেয়েগুলোর দুনিয়া অন্ধকার করে দেয়।

By মুহাম্মাদ শহিদুল ইসলাম Posted in বিবিধ

বিভিন্ন মতবাদ ও ইসলাম

১. বস্তুবাদঃ বস্তু সকল শক্তি ও ক্ষমতার মূল। বস্তুর উন্নতি সাধনের মাধ্যমেই রাষ্ট্র। সমাজ তথা বিশ্বের সামগ্রীক উন্নতি সাধন সম্ভব। এই মতবাদ অনুযায়ী ৫টি বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন হচ্ছে চরম বোকামী। এগুলো হলোঃ

ক. সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস, খ. ধর্মগ্রন্থে বিশ্বাস, গ. তীর্থ স্থান ভ্রমন, ঘ. কৃচ্ছতা সাধন বা উপবাস যাপন ও, ঙ. পরকাল বা পূণর্জন্মবাদে বিশ্বাস। নাস্তিক্যবাদের মূল ভিত্তি হলো এই বস্তুবাদ।
পৃথিবীতে যত ভ্রান্ত মতবাদ রয়েছে তার অধিকাংশের মূলে রয়েছে বস্তুবাদ। সমাজতন্ত্র,ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ, পুঁজিবাদ এবং পাশ্চাত্যের গনতন্ত্রের মূল ভিত্তিও বস্তুবাদ। বস্তুবাদ মানুষকে নীতিহীন বর্বর জানোয়ারে পরিনত করতে পারে। জাতিয়তাবাদের ভয়াবহতার বিস্তার বস্তুবাদের উপর বিশ্বাসের কারনেই ঘটে থাকে।
২.গনতন্ত্রঃ এমন এক রাজনৈতিক ব্যাবস্থা যেখানে দেশের সর্বময় কতৃত্ব একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধির কাছে থাকে এবং এই প্রতিনিধিরা জনগন কতৃক নর্বাচিত হয়ে থাকে। গনতন্ত্রকে প্রধানতঃ দুই ভাগে ভাগ করা হয় যেমনঃ ক. প্রত্যক্ষ গনতন্ত্র ও খ. পরোক্ষ গনতন্ত্র
দুর্বলতাঃ
১. জনগন সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক নয়। যদিও গনতন্ত্রে তাই দাবী করা হয়।
২. জনগন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারেনা।
৩. নির্বাচিত ব্যক্তিদের মাঝে স্বৈরাচারী মনোভাবের বিকাশ ঘটে।
৪. কেবলমাত্র রাজনৈতিক মতবাদ। কোন পরিপূর্ন জীবন ব্যবস্থা নয়।
৫. গনতন্ত্রের বহুমুখী চরিত্রের কারনে এর প্রাতিষ্ঠানিকরুপ স্থায়ীত্ব পায়না।
৩. জাতীয়তাবাদঃ জাতীয়তাবাদ এমন একটি মতবাদ যা একটি জনপদের মানুষের ভাষা, বর্ণ, ধর্ম, অঞ্চল, সংস্কৃতি প্রভৃতি সেন্টিমেন্টের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে। যেমন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, কৃষ্ণাঙ্গ বা স্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ, নাৎসীবাদ, ফ্যাসিবাদ, হিন্দু বা মুসলিম জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি।
দুর্বলতাঃ
১. নিজের জাতির প্রতি অন্ধ ভালবাসার কারনে অপর জাতির লোকেরা নিগৃহিত হয়।
২. নিজের জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অপরের সকল অধিকার হরনে কুন্ঠিত হয় না।
৩. জাতির উপর জাতির কৃতত্ব, দখলদারিত্ব, যুদ্ধ,আগ্রাসন সকল কিছুর মূলে কাজ করে এই জাতীয়তাবাদ।
৪. মানবতাবাদের চরম দুশমন এ মতবাদটি কোন একটি জাতিকে উন্নতির চরম শিখরে পৌছাতে পারলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এই উন্নতি বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি।

জাতীয়তাবাদ ও ইসলামঃ
১. ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ পরষ্পর বিরুধী ২টি আর্দশ।
২. ইসলামের উদ্দেশ্য হলো একটা বিশ্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৩. জাতীয়তাবাদ মানুষের মধ্যে র্পাথক্য সূচিত করে।
৪. মানুষ ও মানুষের মধ্যে ইসলাম কোন বৈষয়কি,বস্তু ভিত্তিক,ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য র্পাথক্য করে না। ইসলামরে দৃষ্টিতে সকল মানুষ একই মুল হতে উদ্ভুত।
৫. মানুষরে কলেমা এক ও অভিন্ন,কালিমা লা ইলাহা এর ভিত্তিতিই বন্ধুত্ব ও শত্রুতা হবে।
৬. এই কালেমা যাকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে রক্ত, মাটি,ভাষা, র্বণ, অন্ন, শাসনব্যবস্থা ও আত্বীয়তা প্রভৃতি কোনটায় সংযুক্ত করতে পারে না।
৭. ইসলামরে দৃষ্টিতে কোন ভাষা, র্বণ, গোত্র, ধন সম্পত্তি কোনটায় বষৈম্য সৃষ্টি করতে পারে না।
৮. ইসলাম মানুষকে একই মাবুদরে উপাসনা করতে আহবান জানায়।
৯. ইসলাম একটি র্সাবজনীন আর্ন্তজাতিক র্ধম ও আর্দশ হওয়ার কারণে জাতীয়তাবাদরে সংর্কীণতাকে সর্মথন করে না।
১০. ইসলাম মানুষকে একই আকীদা, নৈতিকতা, ন্যায়-নীতী খোদাভীতির ভিত্তিতে গড়ে তুলে।
১১. ইসলাম রাজনীতী, র্অথনীতী, সংস্কৃতি ,ইবাদাত বন্দগেীর ক্ষেত্রে কোন বষৈম্য সৃষ্টি করে না।
১২. ইসলামী আর্দশরে অনুসারীদরে জাতী গোষ্ঠী,সম্প্রদয়রে মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করার সুযোগ নইে
১৩. ইসলাম মাটি, মানুষ, বংশ, জাতিগত ভেদাভেদ ও বৈষম্যের দোয়ার ভেঙ্গে সকল মানূষকে একই আর্দশরে পতাকা তলে সমবেত করে ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে একটি র্সাবজনীন কল্যাণ রাষ্ট্র কায়মে করতে চাই।
জাতীয়তাবাদ সর্ম্পকে মাওলানা মওদুদী বলনে,
– জাতীয়তাবাদ ও ইসলাম নিজ নিজ লক্ষ-উদ্দশ্যে, ভাবধারার দিক দিয়ে পরষ্পর বিরোধী।
– যেখানে জাতীয়তাবাদ আছে সেখানে ইসলামের স্থান নেই।
– মুসলমানদের হৃদয়ের এক প্রান্ত দিয়ে যখন জাতীয়তাবাদের চেতনা অনুপ্রবেশ করে তখন অন্য প্রান্ত দিয়ে ইসলাম নিষ্ক্রিয় হয়।
– জাতীয়তাবাদের বিকাশ র্অথ হলো ইসলামের প্রসার ও প্রচারের পথ রুদ্ধ করা।
– ইসলামের চুড়ান্ত ল্যক্ষ হচ্ছে দেশ, জাতী ও র্বণ ভিত্তিক র্পাথক্য দূরীভূত করে একটি আর্দশ ভিত্তিক বিশ্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করা।

৪. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদঃ এটা এমন এক রাষ্ট্রচিন্তা যার কোথাও ধর্মীয় বিশ্বাসের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় না। রাষ্ট্র সীমিত মাত্রায় ব্যক্তি পর্যায়ে ধর্ম পালনের স্বীকৃতি দিলেও এটি একটি বস্তুবাদী রাজনৈতিক দর্শন যা ধর্মকে নির্মূল করার সকল পদক্ষেপই গ্রহন করে থাকে।
দুর্বলতাঃ
১. রাষ্ট্রযন্ত্র ধর্মকে নিরুতসাহিত ও নিষিদ্ধ করে।
২. রাষ্ট্রের উপর ধর্ম বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কতৃত্ব কঠোরভাবে দমন করে।
৩. এ মতবাদটি রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের বিষয়ে আলোচনা করে।
৪. এটি একটি অসম্পূর্ণ মতবাদ যা মানব জীবনের অন্য কোন সমস্যা সম্পর্কে কোন সমাধানই দিতে পারেনা।
৫. সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজিমঃ যে ধরনের রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সকল সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক রাষ্ট্র, ব্যক্তিমালিকানা ও সম্পদ অর্জন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, সবাই রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে, রাষ্ট্র জনগনের নূন্যতম চাহিদাপূরন করে সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সমাজতন্ত্র বলা যায়। এটি একটি বস্তুবাদ নির্ভর নাস্তিক্যবাদী মতবাদ।
দুর্বলতাঃ
১. ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা কঠোরভাবে দমন করা হয়।
২. ধর্মীয় কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।
৩. দল বা শাসকশ্রেনী চরম স্বৈরাচারী হয়ে থাকে। ভোগ-বিলাসের ক্ষেত্রে তারা নিরংকুষ কতৃত্ব ভোগ করে থাকে।
৪. মানুষের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ আদায় করা হলেও মজুরী ও সন্মান সবার সমান।
৫. কেবলমাত্র অর্থনৈতিক দর্শন। মানব জীবনের সামগ্রীক সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ।
৬. পুঁজিবাদঃ ব্যক্তিমালিকানা এই মতবাদের মূলভিত্তি। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তিই সম্পদের মালিক। এতে অন্যের কারো কোন রকম অধিকার নেই। ব্যক্তি স্বার্থপরতার নিকৃষ্টতম উদাহরন পুজিবাদ।
দুর্বলতাঃ
১. সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মাঝে বৈষম্য সৃষ্টিকরে।
২. পুজিপতিরাই রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রন করে থাকে।
৩. বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত শ্রেনীর মাঝে দ্ধন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
৪. সুদ এই অর্থনীতির মূল হাতিয়ার।
৫. আয় বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সমাজ বা নৈতিকতার কোন বাধাই পূঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা রাখেনা।
৬. এটি কোন জীবন দর্শন নয় বরং সম্পূর্ণভাবে এটি অর্থনৈতিক মতবাদ।
ইসলামঃ
১. অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সকল যুগেই ইসলাম শ্রেষ্টতম ও একমাত্র নির্ভুল জীবন ব্যবস্থা।
২. ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন।
৩. যুগে যুগে নবী রাসূলগন মানবজাতীর কাছে এই দ্বীনকে তুলে ধরেছেন। আমাদের নবী হযরর মুহাম্মদ (সঃ) এর আগমনের মাধ্যমে নবী রাসূল প্রেরণের সিলসিলার পরিসমাপ্তি ঘটেছে।
৪. ইসলাম পরপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। যার অনুসরন মানুষের ইহকালে শান্তিনিরাপত্তা ও সন্মান নিশ্চিত করে।একইভাবে পরকালীন নাযাতের পথ প্রদর্শন করে।
৫. ইসলাম মানবজাতীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যাসহ সকল সমস্যার নিশ্চিত ও শ্রেষ্টতম সমাধান দিতে সক্ষম।
অতএব ইসলামই মানব জাতীর মুক্তির একমাত্র পথ।

সমাজতন্ত্রের মূল তত্ত্ব হল একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে সম্পদ ও অর্থের মালিকানা সামাজিক নিয়ন্ত্রণাধীন। সমাজতন্ত্রী ব্যবস্থায় জনসাধারণের প্রয়োজন অনুসারে পণ্য উৎপাদন হয়। সমাজতন্ত্র কমিউনিস্ট সমাজের প্রথম পর্যায়। উৎপাদনের উপায়ে সমাজতান্ত্রিক মালিকানা হলো এর অর্থনৈতিক ভিত্তি। সমাজতন্ত্র উৎখাত ঘটায় ব্যক্তিগত মালিকানার এবং মানুষে মানুষে শোষণের, বিলোপ ঘটায় অর্থনৈতিক সঙ্কটের ও বেকারির, উন্মুক্ত করে উৎপাদনী শক্তির পরিকল্পিত বিকাশ ও উৎপাদন সম্পর্কের পূর্ণতর রূপদানের প্রান্তর। সমাজতন্ত্রের আমলে সামাজিক উৎপাদনের লক্ষ্য_ জনগণের স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি ও সমাজের প্রতিটি লোকের সার্বিক বিকাশ। সমাজতন্ত্রের মুলনীতি হলো প্রত্যেকে কাজ করবে তার সামর্থ্য অনুযায়ী এবং প্রত্যেকে গ্রহণ করবে তার প্রয়োজন অনু্যায়ী। সমাজতন্ত্র দুই ধরনেরঃ ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন-এ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিলো ১৯১৭ সালে।

গণতন্ত্র (শব্দার্থে “জনগণের শাসন”, গ্রিক ভাষার “δήμος”, “জনগণ”, “Κράτος”, “শাসন”, থেকে) হল কোন জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোন সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান ভোট বা অধিকার আছে। যদিও শব্দটি সাধারণভাবে একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয় তবে অন্যান্য সংস্থা বা সংগঠনের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক ইউনিয়ন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

স্বৈরতন্ত্রছ স্বৈরতন্ত্র হচ্ছে একজনের শাসন।যখন কোনো শাসক একাই স্বেচ্ছাচারীভাবে কোনো রাষ্ট্র শাসন ও পরিচালনা করে তখন তাকে স্বৈরতন্ত্র বলা হয়। যখন রাষ্ট্রে এক ব্যক্তির ক্ষমতার মাধ্যমে সকল কাজ সম্পন্ন হয় তাই স্বৈরশাসন।

ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ: ইংরেজী সেকিউলারিজম শব্দ থেকেই এর অনুবাদ। ধর্মীয় প্রবণতাকে মানুষের ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ রেখে সমাজ জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে আল্লাহ ও রাসূলের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার নামই ধর্মনিরপেক্ষতা। সামাজিক, রাজনৈতিক, অথনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ধর্মকে পরিত্যাগ করাই এর উদ্দেশ্য।

মুসলিম প্রধান দেশে সর্বপ্রথম মোস্তফা কামাল পাশাই তুরস্কে এই মতবাদ প্রতিষ্ঠা করে।

হাদীসের মেৌলিক জ্ঞান

হাদীসের মৌলিক জ্ঞান-১

হাদীসের পরিচয়ঃ

হাদীসের সংজ্ঞাঃ রাসূল (সা.)-এর কথা, কাজ এবং মৌন সম্মতিকে হাদীস বলে ।
আছারের সংজ্ঞাঃ সাহাবীদের কথা ও কাজকে আছার বলে ।

হাদীস পরীক্ষা- নিরীক্ষার পদ্ধতি ২টি; যথা-
১.রেওয়ায়াত
দেরায়াত
* রেওয়ায়াত: রেওয়ায়াত হলো সনদের সাথে সম্পৃক্ত । একটি হাদীসের সনদে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের গ্রহনযোগ্যতা বা অগ্রহনযোগ্যতা পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে হাদীসটির স্থান নির্ধারণ করার নামই হলো রেওয়ায়াত পদ্ধতিতে হাদীসের মূল্যায়ন।

* দেরায়াত: দেরায়াত অর্থ- অন্তর্দৃষ্টি ও অভিজ্ঞান। তবে কেবলমাত্র এমন লোকদের দেরায়াত গ্রহণযোগ্য হবে যাঁরা কুরআন,হাদীস ও ইসলামী ফিকহের অধ্যয়ন ও চর্চায় নিজেদের উল্লেখযোগ্য অংশ কাটিয়েছেন এবং এর ফলে তাদের মধ্যে অধ্যাবসায় ও অনুশীলনের এক বিশেষ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার সৃষ্টি হয়েছে এবং যাঁদের জ্ঞান-বুদ্ধিতে ইসলামী চিন্তা ও কর্ম ব্যবস্থার পরিসীমার বাইরের মতবাদ,মূলনীতি ও মূল্যবোধ গ্রহণ করে ইসলামী ঐতিহ্যকে ঐগুলোর মানদন্ডে পরখ করার ঝোঁক প্রবণতা নেই ।

হাদীসের মৌলিক বিষয় সমূহঃ

* সনদঃ হাদীস বর্ণনার ধারাবাহিকতাকে সনদ বলে ।
* মতনঃ হাদীসের মূল অংশকে মতন বলে ।
* রাবীঃ হাদীস বর্ণনাকারীকে রাবী বলে ।
* আদালতঃ সেই সুদৃঢ় শক্তি,যার দ্বারা দ্বীনের উপর অটল ও অবিচল থেকে খোদাভীরুতা ও মনুষ্যত্ব অবলম্বন করতে এবং অন্যায় আচরণ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে ।
* যবতঃ যে শক্তির মাধ্যমে মানুষ শ্রুত বা লিখিত বিষয়কে বিস্মৃতি ও বিনাশ থেকে সংরক্ষণ করতে পারে এবং যখনই ইচ্ছা করে তখনই হুবহু সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারে ।
* মুদাল্লিছঃ গোপন করা । হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে যিনি কোন কিছু গোপন করে একটা অস্পষ্টতা ও অন্ধকারের সৃষ্টি করেন তিনিই হলেন মুদাল্লিছ ।
* ছিকাহঃ যে রাবীর মধ্যে ন্যায় পরায়ণতা,স্মৃতি শক্তি,সংরক্ষণ শক্তি এবং হুবহু প্রকাশ শক্তি বিদ্যমান আছে, তাকে ছিকা রাবী বলে ।

হাদীসের প্রকারভেদঃ

* হাদীস প্রধানত দুই প্রকারঃ

যথা- ১. মাকবুল, ২. মারদুদ
১. মাকবুলঃ হাদীসে মাকবুল ঐ রেওয়ায়াতকে বলা হয় যার সনদে হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তাবলী পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকে ।
২. মারদুদঃ যে রেওয়ায়াতে ঐ শর্তাবলী পুরো মাত্রায় বিদ্যমান না থাকে তাকে মারদুদ বলা হয় ।
মাকবুল হাদীস ২ প্রকারঃ
১. সহীহ
২. হাসান । এরা প্রত্যেকে আবার ২ ভাগে বিভক্ত ।

সুতরাং মাকবুল হাদীস সর্বমোট ৪ ভাগে বিভক্ত।
১. সহীহ লি-যাতিহী (সনদ মুত্তাসিল,রাবী আদিল,হাদীসটি শায ও মুয়াল্লাল নয়) ।
২. হাসান লি-যাতিহী (যার উৎস সর্বজন জ্ঞাত,রাবীগণ সুপ্রসিদ্ধ,যার উপর অধিকাংশ হাদীসের ভিত্তি স্থাপিত,অধিকাংশ আলেম গ্রহণ করে নিয়েছেন,ফকিহগণ দলিল হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন) ।
৩. সহীহ লি-গাইরিহী (কোন রাবীর মধ্যে যদি স্মরণশক্তির দুর্বলতা থাকে এবং অন্যান্য হাদীসের মাধ্যমে যদি তা দূরিভূত হয়) ।
৪. হাসান লি-গাইরিহী (যদি কোন দুর্বল (যইফ) হাদীস বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়ে বর্জনের স্তর হতে গ্রহনের মর্য়াদা লাভ করে,তবে হাদীসটি যইফ হওয়ার কারণ রাবীর ফিছক বা মিথ্যাচার নয় ) ।

* সংজ্ঞা ভিত্তিক হাদীস তিন প্রকারঃ
১.ক্বাওলীঃ রাসূল (সঃ)-এর কথাকে ক্বাওলী হাদীস বলে ।
২. ফে’লীঃ রাসূল (সঃ) বাস্তব জীবনের কাজকে ফে’লী হাদীস বলে ।
৩. তাক্বরিরীঃ রাসূল (সঃ)- এর মৌন সম্মতিকে ত্বাকরিরী হাদীস বলে

রাবীর সংখ্যার দিক থেকে হাদীস দুই প্রকারঃ
১. হাদীসে মুতাওয়াতিরঃ সেই হাদীস প্রত্যেক যুগেই যার বর্ণনাকারীর সংখা এত বেশি যে,তাদের মিথ্যাচারে মতৈক্য হওয়া স্বাভাবিক ভাবেই অসম্ভব
২. হাদীসে আহাদঃ ঐ হাদীস,যার বর্ণনাকারী মুতাওয়াতির পর্যাযয়ে পৌঁছায়নি ।

* হাদীসে আহাদ আবার তিন প্রকারঃ
১. মাশহুরঃ হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবীর পরে কোন যুগেই বর্ণনাকারীর সংখ্যা তিনের কম ছিলনা ।
২. আজীজঃ যার বর্ণনাকারীর সংখ্যা কোন যুগেই দুই এর কম ছিলনা
৩. গরীবঃ যার বর্ণনাকারীর সংখ্যা কোন কোন যুগে এক জনে পৌঁছেছে

*রাবীদের সিলসিলা বা সনদের দিক থেকে হাদীস তিন প্রকারঃ
১. মারফুঃ যে হাদীসের বর্ণনাসূত্র রাসূল (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে ।
২. মাওকুফঃ যে হাদীসের বর্ণনাসূত্র সাহাবা পর্যন্ত পৌঁছেছে ।
৩. মাকতুঃ যে হাদীসের বর্ণনাসূত্র তাবেয়ী পর্যন্ত পৌঁছেছে ।

* রাবী বাদ পড়ার দিক থেকে হাদীস দুই প্রকারঃ
১. মুত্তাসিলঃ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে হাদীসের রাবী সংখ্যা অুক্ষুন্ন রয়েছে, কখনো কোন রাবী উহ্য থাকে না, এরুপ হাদীসকে মুত্তাসিল হাদীস বলে ।
২. মুনকাতিঃ যে হাদীসের বর্ননাকারীদের ধারাবাহিকতা অুক্ষুন্ন না থেকে মাঝখান থেকে উহ্য রয়েছে এরুপ হাদীসকে হাদীসে মুনকাতি বলে

* মুনকাতি হাদীস আবার তিন প্রকারঃ
১. মুয়াল্লাকঃ যে হাদীসের সনদের প্রথম থেকে কোন বর্ণনাকারী উহ্য হয়ে যায় কিংবা গোটা সনদ উহ্য থাকে ।
২. মু’দালঃ যে হাদীসে ধারাবাহিকভাবে দুই বা তদোর্ধ বর্ণনাকারী উহ্য থাকে।
৩. মুরসালঃ যে হাদীসের বর্ণনাসূত্রে তাবেয়ী এবং হুজুর (সা.) এর মাঝখানে সাহাবী রাবীর নাম উহ্য হয়ে যায় ।

* ত্রুটিপূর্ণ বর্ণনার দিক থেকে হাদীস দুই প্রকারঃ
১. শাযঃ যে হাদীসের বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত কিন্তু তার চেয়ে অধিক বিশ্বস্ত রাবীর বর্ণনার বিপরীত ।
২. মুয়াল্লালঃ যে হাদীসের বর্ননাসূত্রে এমন সূক্ষ ত্রুটি থাকে,যা কেবল হাদীস শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞরাই পরখ করতে পারেন ।

রাবীর গুণ অনুযায়ী হাদীস তিন প্রকারঃ
১. সহীহ হাদীসঃ যে হাদীস মুত্তাসিল সনদ (অবিচ্ছিন্ন বর্ণনাসূত্র) বিশিষ্ট, বিশ্বস্ত ও নির্ভর যোগ্য রাবী,রাবী স্বচ্ছ স্মরণ শক্তি সম্পন্ন এবং হাদীসটি শায ও মুয়াল্লাল নয় ।
২. হাসানঃ স্বচ্ছ স্মরণ শক্তি ব্যতীত সহীহ হাদীসের সমস্ত বৈশিষ্ট্যই যার মধ্যে বিদ্যমান।
৩. জয়ীফঃ যে হাদীসে ছহীহ হাদীছের সকল কিংবা কোন কোনটার উল্লেখযোগ্য একটি থাকে তাকে জয়ীফ হাদীস বলে।

* হাদিসে নববীঃ হাদীসে কুদসী ব্যতীত সকল হাদীস ।
* শাইখঃ হাদীসের শিক্ষককে শাইখ বলে ।
* মুহাদ্দিসঃ সনদ মতন সহ হাদীস চর্চাকারী ও গভীর জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি ।
* হাফিজঃ সনদ মতন সহ এক লক্ষ হাদীস আয়ত্বকারী ।
* হুজ্জাতঃ সনদ মতন সহ তিন লক্ষ হাদীস আয়ত্বকারী ।
* হাকিমঃ সনদ মতন সহ সমস্ত হাদীস আয়ত্বকারী ।
* বেশি হাদীস বর্ণনাকারীঃ
পুরুষদের মধ্যে – হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) (৫৩৭৪)
মহিলাদের মধ্যে – হযরত আয়েশা (রাঃ) (২২১০)

জাল হাদীস সংক্রান্ত কথাঃ-

মওদু বা জাল হাদীস হচ্ছে সেই হাদীস যে হাদীসের মধ্যে সনদের বর্ণনাকারীদের সংখ্যা অন্তত কোন এক স্তরে একজন রাবী এমন আছে যাকে মিথ্যাবাদী বলে চিহ্নিত করা যায় । রাসূল (সাঃ) যে কথা বলেননি সে কথাকে তাঁর নামে চালিয়ে দেওয়া মারাত্মক অপরাধমূলক কাজ । এর পরকালীন পরিণাম নিশ্চিত জাহান্নাম । রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন “মান কাজ্জাবা আলাল মুতায়াম্মেদান ফাল এতাবায়য়ায়ূ মাকআদাহু মিনান নার”-‘যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করল সে যেন জাহান্নামে তার বসার স্থানটি খুজেঁ নেয়’।
মওদু বা জাল হাদীসের সূচনা হল যখন যেভাবেঃ-
* রাসূল (সঃ)- এর যুগের একটি ঘটনাঃ-
মদীনার এক ব্যাক্তি কোন এক গোত্রের একটি কন্যাকে বিয়ে করতে চাচ্ছিল কিন্তু কন্যা পক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে দেয় । হিজরতের পর প্রথম দিকে ঐ ব্যাক্তি একটি জুব্বা পরে সেই গোত্রে গিয়ে পৌঁছে এবং কন্যা পক্ষের নিকট গিয়ে বলে রাসূল (সাঃ) নিজে আমাকে এই জুব্বা পরিয়েছেন এবং আমাকে এই গোত্রের প্রশাসক নিয়োগ করেছেন,গোত্রের লোকেরা রাসূল (সাঃ) কে ঘটনাটি অভহিত করে । মহানবী (সাঃ) এটা শুনে বলেছেন “মিথ্যা বলেছে আল্লাহর এই দুশমন,যাও তাকে যদি জীবন্ত পাও হত্যা কর আর যদি মৃত পাও তার লাশ আগুনে জ্বালিয়ে দাও” । রাসূলের (সাঃ)-এর পক্ষ থেকে একজন ব্যক্তি সেখানে গিয়ে দেখল সাপের কামড়ে লোকটি মারা গেছে অতএব নির্দেশ অনুযায়ী তার লাশ আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হল। এরপর মহানবী (সাঃ) সাধারণ্যে ঘোষণা দিলেন- “যে আমার নাম নিয়ে মিথ্যা কথা বলে সে যেন জাহান্নামে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়” । এই কঠোর সতর্কতামূলক কার্যক্রমের ফলে প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর মনগড়া হাদীস ছড়ানোর দ্বিতীয় কোন ঘটনা ঘটেনি ।
* জাল হাদীসের সূত্রপাতঃ
হযরত আলী ও মুয়াবিয়া (রাঃ) এর মধ্যে সংঘটিত দুঃখ জনক ঘটনার ফলে উভয় পক্ষের অতি উৎসাহী ভক্ত ও অনুসারীদের পরস্পরের প্রতি বাড়াবাড়িমূলক কর্মকান্ডের ফলে জাল হাদীস বা মওদু হাদীসের উৎপত্তি হয়।

* হাদীস জাল করার কারণ ও উদ্দেশ্যঃ

১. জিন্দিকগণ পারসিক জিনদের ধর্মাবলম্বী একদল লোক বাহ্যত নিজেদেরকে মুসলমান বলে পরিচয় দিত, কিন্তু প্রচ্চন্ন ভাবে ইসলামের ক্ষতি সাধনের চেষ্টায় থাকত । এ সমস্ত লোকেরা ইসলামের মূলনীতি ও বিশ্বাসের প্রতি মানুষকে শ্রদ্ধাহীন করার জন্য রাসুলের (সাঃ) নামে অযৌক্তিক হাজার হাজার হাদীস প্রচলন করে । তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের অনিষ্ট সাধন ।
২. অতি পরহেজগারগণ নিজেদেরকে সূফি প্রমানের লক্ষে জাল হাদীস তৈরি করত ।
৩. সদুদ্দেশ্যে
৪. তর্কবিতর্কের ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ)- এর শ্রেষ্টত্ব প্রমানের জন্য মনগড়া হাদীস বর্ণনা করে ।
৫. যুদ্ধে উত্তেজিত করার জন্য ।
৬. মুকাল্লিদগণঃ ভিবিন্ন ইমামদের অনুসারীরা নিজেদের ইমামের শ্রেষ্টত্ব প্রমানের জন্য জাল হাদীস রচনা করে ।
৭. মুসাহেবগণঃ রাজা-বাদশা ও আমীর উমরাহদের মুসাহেবগণ নিজেদের প্রভুকে খুশি করার জন্য জাল হাদীস বর্ণনা করত ।
৮. বক্তাগণ ।
৯. অসতর্কতা ও অন্ধভক্তি ।
১০. সুফিগণ ।

* কয়েকটি মাওযু হাদীসঃ

১. আমার উম্মতের আলিমগণ বনি ইসরাইলের নবীগনের সমতুল্য,
২. আলিমগনের/জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও উত্তম,
৩. স্বদেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ,
৪. কলব (অন্তর) হচ্ছে রবের ঘর,
৫. সুদূর চীন দেশে গিয়ে হলেও জ্ঞান অর্জন কর,
৬. পাগড়ী পড়া ১ রাকাত নামাজে ২৫ রাকাতের সওয়াব – ইত্যাদি ।

* জাল হাদীসের লক্ষণঃ

১. স্বীকারোক্তি
২. যে সকল হাদীসের প্রত্যক্ষ শর্তের বিপরীত কোন কিছু বর্ণিত হয় তা জাল হাদীস । যেমন – বেগুন সকল রোগের ঔষধ ।
৩. জীবনে একবারও হাদীস জাল করেছে বা জেনে শুনে জাল হাদীস প্রচার করেছে এমন ব্যাক্তির বর্ণিত হাদীস ।
৪. যে হাদীসের বর্ণনা মূলের বিপরীত ।
যেমন- সূর্য তাপে তক্ত জ্বলে,স্নান করলে কুষ্ঠ রোগ হয় ।
৫. খাজা-খিজির সম্মন্ধে বর্ণিত সকল হাদীস ।
৬. যে হাদীসে কোন জঘন্য ভাবের সমাবেশ আছে ।
৭. যে হাদীসের ভাষা অশোভনীয় ।
৮. যে হাদীসে এমন ঘটনা উল্লেখ আছে যে,তা ঘটে থাকলে বহুলোক জানার কথা ছিল,অথচ মাত্র একজন রাবী তা বর্ণনা করেছে ।
৯. যে হাদীসে অনর্থক মুল্যহীন কথা আছে ।
১০. যা কুরআন,সহীহ হাদীস ও কাতয়ী ইজমার বিপরীত ।
১১. যে সকল হাদীসে সামান্য কাজের জন্য বড় বড় সওয়াব এবং সামান্য অপরাধের জন্য কঠোর দন্ডের ওয়াদা করা হয়েছে ।

* যাদের হাদীস গ্রহণ করা যাবেনাঃ-

১. রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি মিথ্যা আরোপকারী ।
২. সাধারণ কথা বার্তায় যারা মিথ্যা কথা বলে ।
৩. বিদয়াতী প্রবৃত্তির অনুসারী ।
৪. জিন্দিক,পারসিক,অমনোযোগী ও অসতর্ক ব্যাক্তিবর্গ এবং যাদের মধ্যে আদালত,যাত ও ফাহাম (ন্যায় পরায়ণতা, বুদ্ধিমত্তা) ইত্যাদি গুণাবলীর অনুপস্থিতি থাকবে ।

* হাদীস জালকারীদের কয়েকজন/মুহাদ্দিসগনের নিকট মিথ্যাবাদি হিসেবে আধিক পরিচিত যারাঃ

১. আবান্ যাফার আন-নুমাইরীঃ এই ব্যক্তি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর নামে তিন শতাধিক হাদীস ছড়িয়েছেন ।
২. ইবরাহীম ইবনে যায়িদ আল-আসলামীঃ এ ব্যক্তি ইমাম মালিক (রহঃ)-এর নামে বহু হাদীস ছড়িয়েছেন ।
৩. আহমদ ইবনে আবদিল্লাহ আ-জুওয়ায়বারীঃ সে সিয়াদের কাররামিয়া সম্প্রদায়ের নামে হজার হাজার হাদীস বর্ণনা করে ।
৪. জাবির ইবনে ইয়াজিদ আল-যুফিঃ তার সম্পর্কে সুফিয়ান বলেন,আমি জাবিরকে বলতে শুনেছি সে প্রায় ত্রিশ হাজার জাল হাদীস বর্ণনা করেছে ।
৫. মহাম্মদ ইবনে সুজা আছ-ছালজীঃ সে সৃষ্ট বস্তুর সাথে আল্লাহর সম্পর্ক সাদৃশ্যমূলক বিষয়ে বহু হাদীস তৈরী করে মহাদ্দীসদের নামে ছড়িয়েছে ।
৬. নুহ ইবনে আবি মারিয়ামঃ সে কুরআনের নানাবিধ ফজীলত ও বিভিন্ন সূরার সাহাত্ম্য ও মর্যাদা বিষয়ক বহু হাদীস তৈরী করে ছড়িয়েছে ।
* ইমাম আন-নাসাই (রহঃ) বলেন- জাল হাদীস রচনার সাথে জড়িত মিথ্যাবাদী হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভকারী ব্যক্তি চারজনঃ
১. মদীনায় ইবনে আবি ইয়াহইয়া
২. বাগদাদে আল-ওয়াকিদী
৩. খুরাসানে মুকাতিল
৪. শামে মুহাম্মদ ইবনে সাইদ আল-মাসলুব ।

হাদীসের মৌলিক জ্ঞান-২

হাদীস সংকলনঃ-
* রাসূল (সাঃ)-এর জীবদ্দশায়ঃ
ঐতিহাসিক বালাযুরির মতে রাসূল (সাঃ)-এর নবূয়াতি জীবনে তখন মক্কায় শিক্ষিত লোকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১১ জন। এমতাবস্থায় রাসূল (সাঃ) যখন প্রেরীত হন তখন তাঁর সামনে সর্বপ্রথম গুরুত্বপূর্ন কাজ ছিল,ক্রমাগতভাবে নাজিল হওয়া কুরআন এমনভাবে সংরক্ষণ করা যাতে এর মধ্যে কোন জিনিসের সংমিশ্রণ না ঘটে । এজন্য তিনি এই মর্মে নির্দেশ দেন-
হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন-“তোমরা আমার কোন কথা লিখনা । কেউ যদি কুরআন ছাড়া আমার কথা লিখে থাকে সে যেন তা মুছে ফেলে” ।
* হাদীস লেখার সাধারণ অনুমতিঃ
রাসূল (সাঃ) মদীনায় পৌঁছার অল্পকিছুদিনের মধ্যেই সাহাবী এবং তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখার ব্যবস্থার ফলে রাসূল (সাঃ) সুন্নাহ শেখার অনুমতি দেন।
* এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন-
১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আল-আস (রাঃ) (লিখনির মাধ্যমে)
২. হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) (মুখস্ত করার মাধ্যমে) (৫৩৭৪ টি হাদীস )
৩. আব্দুল্লাহ ইবনুল আব্বাস (রাঃ)
৪. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)
৫. যাবির ইবনে আব্দিল্লাহ (রাঃ)
৬. উম্মুল মুমিনীন আয়শা (রাঃ) (২২০০ টি হাদীস )

রাসূল (সাঃ) এর ওফাতের পরঃ খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলঃ
* প্রথম খলিফা হযরত আবুবকর (রাঃ) এর আমলে সুন্নাহ সংগ্রহ ও সংকলনের সরকারী কোন উদ্যোগ নেয়া হয় নাই। এই সময় অপরাপর সকল সাহাবী (রাঃ) জীবিত থাকা,খিলাফতের ব্যস্ততম অবস্থা তথা খলিফা মাত্র দুই বছর ছয়মাস সময় পেয়েছিলেন । হযরত আবুবকর (রাঃ) ১৪২ খানা হাদীছ বর্ণনার কথা ইমাম সুয়ুতী মারফত জানা যায়।
* দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর আমলে তিনি হাদীস সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন কিন্তু তিনি দীর্ঘ একমাস ইস্তেখারা করার পর এই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
* তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান (রাঃ)ও রাসূল (সঃ)-এর সতর্কতার প্রতি অতীব সাবধানতার কারনে হাদীস সংকলনের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।
* চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ), যে কজন সাহাবী নিজেদের হাতে রাসূল (সঃ)-এর নিকট শ্রুত হাদীস লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন তাদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অন্যতম। হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট সাদকা, যাকাত এবং ব্যাবহারিক কাজকর্ম সম্পর্কিত হুকুম আহকামের কয়েকটি হাদীস লিখিত ছিল । এই হাদীস সমষ্টির তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘সহীফা’। পরবর্তীতে তিনি এই সহীফাখানাকে হাদীসের একখানি দস্তবেজ হিসেবে হযরত উসমান (রাঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দেন।
* তবে এই সময়ে সরকারী উদ্যোগে হাদীস সংকলন না হলেও মহান সাহাবী এবং তাবেঈদের একটি বিশাল অংশ ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে হাদীস সংগ্রহের কাজে লিপ্ত ছিলেন। বয়োজ্যেষ্ঠ তাবেঈগনের মধ্যে ৯৯ জনের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। হিজরী ১ম শতকের শেষে এবং দ্বিতীয় শতকের শুরুতে বয়োকনিষ্ঠ তাবেঈ ও তাবেতাবেঈগনের ২৫২ জনের নাম পাওয়া যায়। যাদের নিকট হাদীসের লিখিত পান্ডুলিপি বিদ্যমান ছিল। এইভাবে সাহাবী তাবেঈ এবং তাবেতাবেঈ মিলে ৪০৩ জন রাবীর নাম পাওয়া যায়।

*হাদীস সংকলনের সরকারী উদ্যোগঃ
১. হাদীস সংকলনের সরকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় হিজরী ৭৫ সন বা তার কাছাকাছি সময়ে। ঐতিহাসিক সুত্রে জানা যায় দ্বিতীয় ওমরের পিতা- আব্দুল আযীয ইবনে মারওয়ান মিসরের ওয়ালী থাকাকালে হাদীস লিপিবদ্ধ করনের প্রয়োজন উপলব্ধি করেন। অতঃপর তিনি সমকালীন হাদীস বিশারদ হজরত কুছায়্যির ইবনে মুররাকে (যিনি হিমসে রাসূল (সাঃ) এর সত্তরজন বদরী সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন) সাহাবীদের কাছথেকে প্রাপ্ত সকল হাদীস খলিফার দরবারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

২.পরবর্তীতে খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আযীয এ উদ্যোগকে আরো অগ্রসর করেন। তিনি সর্বত্র ও সর্বদা এ কথাটি উচ্চারণ করতেন-“ওহে জনগণ ! দান অনুগ্রহকে কৃতজ্ঞতা দ্বারা এবং জ্ঞানকে গ্রন্থের দ্বারা বন্দী কর”। তিনি নিন্মোক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেনঃ
ক) মদীনার তৎকালীন আমীর, বিখ্যাত ইমাম ও সমকালীনদের মধ্যে বিচার কাজে সর্বাধিক দক্ষ ও বিচক্ষণ ব্যক্তি হযরত আবু বকর ইবনে হাজমকে (তৎকালীন মদীনার শাসক, বিচারক ও হজ্জ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োযিত, উম্মুল মোমিনীন আয়শা (রাঃ) এর তত্বাবধানে লালিত পালিত,হযরত আয়শা (রাঃ) এর বর্ণিত হাদীস বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী,(ইন্তিকাল হিজরী ৯৮ মতান্তরে ১০৬ সন) স্বীয় চিন্তার ও শঙ্কার কথা উল্লেখ করে হাদীস লেখার নির্দেশ দেন।
খ) সে যুগের শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ হযরত ইবনে শিহাব আয-যুহরীকেও (হাফেজে হাদীস,আরবের বংশবিদ্যায় পারদর্শী,মাত্র ৮০ রাতে কুরআন মুখাস্তকারী,৯০ টি হাদীসের ধারক যা তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানতেন না,সর্ব প্রথম হাদীস সংকলনকারী) এ ব্যাপারে পত্র লেখেন।
গ) এছাড়াও ওমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহঃ) ইসলামী খিলাফতের সকল শহর ও জনপদে রাসূলের (সাঃ) হাদীস সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরনের নির্দেশ সম্বলিত ফরমান পাঠান।
অতঃপর খলিফা সংগৃহীত হাদীসের পান্ডুলিপি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেন এবং সর্বস্থানে ও সর্বজনে হাদীসের ব্যাপক চর্চার নির্দেশ দেন।
* সর্বপ্রথম হাদীস সংকলনঃ
ইবনে হাজারের মতে – হাদীস সমূহ বিষয় ভিত্তিক বিভিন্ন অধ্যায়ে সর্বপ্রথম সংকলন করেন – হযরত ইমাম আশ-শাবী (রহঃ)।
এ যুগে আরো যারা অবদান রাখেন তারা হলেনঃ ইমাম আবু ইউসুফ (হি ১১৩-১৮২), ইমাম মুহাম্মদ (হি-১৩১-১৮৯), ইমাম মালিক (রহঃ), মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (মৃ-১৮১হি)
* হিজরী দ্বিতীয় শতকের হাদীসের বিখ্যাত সংকলন সমূহঃ
১) ইমাম মালিক ইবনে আনাছ (রহঃ) (মৃ-১৭৯ হি) এর আল-মুয়াত্ত্বা, ২) ইমাম আশ-শাফেয়ী (মৃ ২০৪ হি) এর আল-মুসনাদ ও মুখতালাফুল হাদীস,
৩) ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (মৃ ২১১হি) এর আল-জামি,
৪) শুবা ইবনে আল-হাজ্জাজ (মৃ ১৬০ হি) এর মুসান্নাফ ।
এছাড়াও ইমাম মালিক,ইমাম আবু ইউসুফ,ইমাম মুহাম্মদ,মহাম্মদ ইবনে ইসহাক,ইবনে সাদ,ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং আবু বাকার ইবনে আবী শাইবার সংকলনগুলো বর্তমানকাল পর্যন্ত বিদ্যমান আছে,

* হিজরী তৃতীয় শতকে হাদীস সংকলনঃ
১) এই সময়টি ছিল ইলমে হাদীস চর্চা,লিখন ও পঠন-পাঠনের স্বর্ণযুগ। এ সময়ে ইলমে হাদীসের এক-একটি বিভাগ সম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্রভাবে গঠিত হয়। এ শতকের মুহাদ্দীসগণ রাবী ও হাদীসের সন্ধানে জলে-স্থলে,গ্রাম-গন্জে,শহরে-নগরে এবং দেশ থেকে দেশান্তরে তন্ন তন্ন করে খুজে বিক্ষিপ্ত হাদীস সমূহ পূর্ণ সনদসহ সজ্জিত ও সুবিন্যস্ত করেন। এ যুগে ইলমে হাদীস সংকলন সূচনা করা হয় মুসনাদ (রাবী ভিত্তিক) পদ্ধতিতে । এরই ধারাবাহিকতায় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) (মৃ-২৪১ হি.) এর হাত দিয়ে বেরিয়ে আসে হাদীসের বিখ্যাত ‘মুনাদ’ গ্রন্থটি । তার সারা জীবনের সংগৃহীত সাত লক্ষ হাদীস থেকে মাত্র ত্রিশ হাজার হাদীস মুসনাদে সংকলিত করেন।
২) এর পর আবির্ভাব ঘটে হাদীস যাচাই-বাচাই, সংগ্রহ-সংকলন জগতের দুই উজ্জল নক্ষত্রের,তারা হলেনঃ ১. মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (হি ১৯৪-২৫৬)
২. মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ আল-কুশায়রী আন-নিসাপুরি (হি ২০৪-২৬১)
এরপর তাদের দুজনের পদাঙ্ক আনুসরন করে আরো আনেকে হাদীস সংকলনে আত্মনিয়োগ করেন। তার মধ্যে চারখানা সুনান গ্রন্থ সর্বাধিক প্রসিদ্ধঃ
৩/১. সুনানু মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ্ (মৃ.২৭৩ হি)
৪/২. সুনানু আবী দাউদ আস-সিজিস্থানী (মৃ ২৭৫ হি)
৫/৩. সুনানু আবী ইসা আত-তিরমিজি (মৃ২৮৭ হি)
৬/৪. সুনানু আহমাদ ইবনে আলী আন-নাসাঈ (মৃ ৩০৩ হি)

*হিজরী চতুর্থ শতকে হাদীস সংকলনঃ
এ সময়ে হাদীস সংগ্রহ,সংকলন,যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা -নিরীক্ষার যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হয়। পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা –নিরীক্ষার উপর ভিত্তি করে একটি হাদীসকে একাধিক সনদসুত্রে বর্ণনা করেছেন এ সময়ের আলেমগণ ।
তাদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজন ইমাম হলেন-
১. সুলাইমান ইবনে আহমাদ আত-তাবারানি (মৃ ৩৬০ হি), গ্রন্থ- আল-মুজাম
২. আদ-দারাকুতনি (মৃ ৩৮৫ হি)
৩. ইবনে খুযাইমা (মৃ ৩১১হি)
৪. আত-তাহাবী (মৃ ৩২১ হি)

ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন যুদ্ধের সময় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর যে কয়জন পাহারাদার ছিলেন যারা………..।

১. বদরের যুদ্ধে : হযরত সা’দ ইবনে মোয়ায (র.)
২. ওহুদের যুদ্ধে : হযরত যাকওয়ান ইবনে আবদে কায়েস (র.) ও হযরত মুহাম্মদ ইবনে সালামা আনসারী (র.)
৩. খন্দকের যুদ্ধে : হযরত যুবায়ের (র.)
৪. কুরার যুদ্ধে : হযরত আবু ইউয়ুব (র.) ও হযরত বিলাল (র.)

আল-কুরআনের মৌলিক জ্ঞান

ভূমিকাঃ
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানবজীবনের জন্য একমাত্র পূর্নাঙ্গ জীবন বিধান। এতে রয়েছে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সমাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকসহ সামগ্রীক বিষয়ের যাবতীয় সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান। অপূর্ব শব্দচয়ন,গুরুগম্ভীর ভাব এবং অনুপম গাঁথুনির কারনে এর সঠিক মর্মার্থ উপলব্দিকরা সবার পক্ষ্যে সমান ভাবে সম্ভব নয়। এজন্য একজন মোমীনের কুরআনের জ্ঞানের পরিধির সীমা-পরিসিমার পর্যায় জানা বা নির্ধারন করাও অসম্ভব। তবে কুরআনের প্রাথমিক ও মৌলিক জ্ঞান তথা পরিচয় একজন মোমীন মাত্রই জানা উচিৎ।

জ্ঞানের প্রকৃত উৎসঃ
মৌলিক ভাবে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম ৩টি- যথা- পঞ্চ ইন্দ্রিয়, আকল ও ওহী
১.পঞ্চ ইন্দ্রিয় (দিন-রাত,গরম ঠান্ডা,দুঃখ-কষ্ট,আরাম-আয়েশ)
২.আকল ৩ ভাবে বিকশিত হতে পারে যথা-
ক) বুদ্ধি, মস্তিষ্ক, চিন্তা-গবেষনালব্দ জ্ঞান
খ) ইতিহাস লদ্ধ জ্ঞান অর্থাৎ অভিজ্ঞতা
গ) মানবীয় সীমাবদ্ধ জ্ঞান ভিত্তিক বিজ্ঞানলব্ধ জ্ঞান (অনিশ্চিত ভাবে- ভাল খারাফ,কল্যান অকল্যান,)
উপরোক্ত জ্ঞানের উৎসগুলো দ্বারা সত্য উপলদ্ধির প্রেরণা লাভ করা যেতে পারে কিন্তু এগুলো প্রকৃত সত্যের সন্ধান দিতে পারেনা। তাই এই চারটি উৎস দ্বারা মানুষ নির্ভুল কোন মত ও পথ এবং জীবন বিধান রচনা করতে পারেনা এবং পারবেনা। তার প্রমাণ গত একশ বছরে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে অসংখ্য মতবাদ ও পথ রচনা করা হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীতে তা বারে বারেই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।
৩.ওহীর বা প্রত্যাদেশলদ্ধ জ্ঞান। ওহী ভিত্তিক জ্ঞানই হচ্ছে একমাত্র নিখূত, নির্ভূল, চিরন্তন শাশ্বত ও অকাট্য জ্ঞান। যা একমাত্র মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই প্রদান করা হয়ে থাকে। এই ওহীর ধারা বাহিকতাই প্রথিবীতে একশত চারখানা কিতাব যুগে যুগে অসংখ্য নবীও রাসূল (সাঃ) এর উপর অবতীর্ন করা হয়। তন্মধ্যে প্রধান কিতাব হচ্ছে ৪ খানা। যথা-
১) তাওরাত হযরত মূসা (আঃ) এর উপর অবতীর্ন হয়।
২) যাবুর হযরত দাউদ (আঃ) এর উপর অবতীর্ন হয়।
৩) ইনজীল হযরত ইসা (আঃ) এর উপর অবতীর্ন হয়।
৪) আল-কুরআন হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর উপর অবতীর্ন হয়।

কুরআনের আভিধানিক অর্থঃ
১) মাওলানা মওদুদী বলেন- কুরআন শব্দটি কারায়া থেকে নির্গত। এর আসল অর্থ পাঠ করা । যেহেতু কুরআন বার বার পাঠ করা হয়।
2) লিসানুল আবর গ্রন্থ প্রণেতা বলেন- কুরআন শব্দটি মাসদার ও হামযা যুক্ত কারউন থেকে উৎপন্ন এর অর্থ পাঠ করেছে। এখানে মাসদার কে মাফউলের অর্থে তথা মাকরুউন অর্থাৎ পঠিত অর্থে গ্রহন করা হয়েছে। যেহেতু কুরআন মজিদ বিশ্বের সর্বাদিক পঠিত গ্রন্থ।
3) আল-আশয়ারীর মতে, কুরআন শব্দটি কারউন ধাতু থেকে নির্গত। অর্থ সন্নিবেশিত করা। যেহেতু কুরআন মজিদে পূর্বের সকল আসমানী কিতাবের সারবস্তু জমা করে দেয়া হয়েছে।

কুরআনের পারিভাষিক অর্থঃ
১) ইসলামী পরিভাষায় অধিকাংশ মুফাসসীরদের বর্ণনার আলোকে কুরআনের সংজ্ঞা দেওয়া যায় এভাবে-মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে, “লাওহে মাহফুজ” থেকে, হযরত জিব্রাইল আমীনের মাধ্যমে , মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর নবুয়তের ২৩ বছর জীবনে মানব জাতির বিভিন্ন প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে যে ওয়াহী নাযিল করা হয় তাকে কুরআন বলা হয়।
২) মাওলানা মুহাম্মদ আলী আস সাবুনী বলেন-কুরআন আল্লাহ তায়ালার সেই অতিশয় পবিত্র ও সম্মানিত কালাম, যা তিনি সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর জিব্রাইল (আঃ) মাধ্যমে ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে ২৩ বছর যাবৎ অবতীর্ন করেছেন। যে কালাম কিয়ামত পর্যন্ত সামান্যতম রদ-বদল থেকেও সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে এবং যার হেফাযতের দ্বায়িত্বশীল স্বয়ং আল্লাহ। (আত তীবয়ানু ফী উলুমিল কুরআন)
৩) মান্না আলা কাত্তান বলেন-কুরআর মাজীদ আল্লাহ তা’য়ালার কালাম। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর ইহা অবতীর্ণ। এর তেলাওয়াত করা ইবাদত। (মাবাহিস ফী উলুমিল কুরআন পৃ ২১)
৪) আল্লামা ফখরুল ইসলাম বাযদাবী বলেন- কুরআর ঐ কিতাব যা রাসূলের উপর অবতীর্ণ হয় এবং যা সহীফা সমূহে লিপিবদ্ধ । আর যা রাসূল (সাঃ) হতে ধারাবাহিকভাবে সন্দেহাতিতরুপে বর্ণিত।

কুরআনের বিষয়বস্তুঃ মানুষ-
অথ্যাৎ কিসে মানুষের কল্যাণ ও আর কিসে মানুষের অকল্যাণ,পবিত্র কুরআন তা বলে দিবে । এর সাথে জড়িত রয়েছে ৩টি বিষয় । যথাঃ-
১) আল্লাহ তায়ালার যথার্থ পরিচয় ।
২) আল্লাহর সাথে মানুষের সঠিক সম্পর্ক ।
৩) মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক।

কেন্দ্রীয আলোচ্য বিষয়ঃ
মানুষ জ্ঞানের অভাবে প্রবৃত্তির দাসত্বের কারণে নিজের সত্বা ও পার্থিব জীবন সম্পর্কে যে মতবাদ রচনা করেছে তা ভুল প্রমাণিত। প্রকৃত পক্ষে মানুষ দুনিয়াতে আল্লাহর খলিফা হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে ।
কুআনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যঃ দুনিয়াতে শান্তি ও আখিরাতের মুক্তি ।
মানব রচিত সকল মতবাদকে পরাভূত করে আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীনকে পরিপূণবিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অজর্ন করা ।
সূরা আল ফাতাহ -২৮ সূরা আস্সফ-৯

কুরআনের শেষ লক্ষ্যঃ
সমগ্র মানব জাতিকে নির্ভূলকর্মনীতি আল্লাহর প্রদত্ত জীবন বিধানের দিকে আহবান করা, যা সে ভূলে গেছে নিজের কারনে । যাতে সে দুনিয়াতেও নিজের জীবনকে কল্যাণময় করতে পারে এবং পরকালেও শান্তিময় জীবন লাব করতে পারে ।
আবার বিষয় বস্তুর দিক দিয়ে কুরআন কে মৌলিক ভাবে ৫ ভাগে ভাগ করা হয়

কুরআন পৃথিবীর একমাত্র নিভূল গ্রন্থঃ
১.ইহা এমন কিতাব যাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। সূরা বাকারা- ২
২.নিশ্চয় কুরআন আমিই নাযিল করেছি, আর এর হিফাজতের দায়িত্ব আমারই হাতে।
৩. কুরআন কেবলই আমার পক্ষথেকে মোহাম্মদ (সাঃ) যদি এর মধ্যে কম বেশি করতেন তাহলে আমি অবশ্যয় তার কন্ঠ চেপে ধরতাম।

কুরআনে বর্নিত মূল প্রতিপাদ্য বিষয়াদি ৫ প্রকার । যেমন
এক) ইলমুল আহকাম বা সাংবিধানিক জ্ঞান।অর্থাৎ ইবাদত-উপাসনা,লেন দেন,ঘর সংসার,আচার অনুষ্ঠান ও রাজনীতিসহ যে কোন ক্ষেত্রে ফরজ, ওয়াজিব , মুস্তাহাব , হারাম মাকরুহ , ও মুবাহ সহ সকল বিধি-বিধান এই মূলনীতির অন্তর্ভুক ।এই বিষয়ে আলোচনার জন্য ফকিগনই অধিক যোগ্য।
দুই) ইলমুল মখাসামা তথা তর্ক শাস্ত্রীয় জ্ঞান।ইহুদী ,নাসারা, মুশরিক ও মুনাফেক এ চার ভ্রষ্টদের সাথে তর্ক শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন করা। এধরনের ইলমের আলোচনার জন্য মোতাকাল্লেমীন অর্থাৎ দার্শনিকরাই অধিক যোগ্য।
তিন) ইলমূত তাযকীর বি আলাইল্লাহ অর্থাৎ- আল্লাহর পরিচয়, গুনাবলী , সৃষ্টি ক্ষমতা,আসমান যমিন ইত্যাদির আলোচনা
চার) ইলমুত তাযকীর বি আয়্যামিল্লাহ তথা আল্লাহ তায়ালার সৃজিত বিশেষ ঘটনা সমুহের জ্ঞান।হেদায়াত ও গোমরাহী সম্পর্কে আলোচনা : অন্যান্য নবী রাসূল দের শরীয়াত ,ইতিহাস ও তাদের উত্থান পতন সহ আলোচনা ।
পাঁচ) ইলমুত তাযকির বিল মাউত তথা পারলৌকিক জ্ঞান অর্থাৎ মৃত্যু ও মৃত্যু পরবতী জীবন সম্পর্র্কে আলোচনা কবর , হাশর , মিজান, দাজ্জাল, আমলনামা ,দিদারে এলাহী ইত্যাদি

ওয়াহীর শাব্দিক অর্থ :
১) গোপনীয়তা
২) দ্রুততা
ওয়াহীর আভিধানিক অর্থ ঃ ”এমন দ্রুত সংবাদ যা ঐব্যক্তি জানেন ,যার নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। অন্যদের কাছে তা গোপন থেকে যায়”। (মাবাহিসফী উলুমিল কুরআন)

শাব্দিক অথের্র প্রেক্ষিতে আরো কয়েকটি অর্থ হতে পারে যথা-
ক) মানুষের অন্তরে স্বভাবগত ইলহাম-
যেমন-মুসার মায়ের অন্তরে আমি ইঙ্গিত নিদের্শ করলাম ,শিশুটিকে দুধ পান করাতে ।
খ)কোন প্রাণীর অন্তরে গচ্ছিত ইলহামঃ
যেমন – তোমার প্রতিপালক মৌমাছি কে তার অন্তরে ইংগিত দিয়েছেন পাহাড়,বৃক্ষে ও মানুষের ঘরে গৃহ নির্মাণ করতে ।
গ) অতি দ্রুত কোন ইংগিত করা যেমনঃ অতঃপর তিনি (যাকারিয়া ) তাদেরকে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতে বললেন
ঘ) আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেস্তাদের প্রতি ওয়াহী যেমনঃ তোমরা প্রতিপালক ফেরেস্তাদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেছেন ।

ওয়াহীর পারিভাষিক সংজ্ঞাঃ
১)শরীয়াতের পরিভাষায় ওয়াহী হল- আল্লাহ তায়ালার বাণী ,যা তার নবী গণের মধ্যে থেকে কোন নবীর উপর নাযিল করা হয়েছে।(মাবাহিসফী উলমুল কুরআন )

২)ওস্তাদ মুহাম্মদ আব্দুহু তার রিসালা আতত্ওহীদ গ্রস্থে বলেন- দৃঢ়তার সাতে ব্যক্তির আপন অন্তরে কোন বিষয়ে আরল্লাহর পক্ষ থেকে জ্ঞান পাওয়া । সে জ্ঞান কোন মাধ্যমে হতে পারে অথবা কোন মাধ্যম ছাড়া হতে পারে ।

• ওয়াহীর প্রকার ঃ
ওয়াহীকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় ঃ
১)মাতলুঃ কুরআনকে মাতলু বলা হয় । এর অর্থ যা তেলাওয়াত করা হয় । কুরআন তেলাওয়াত করা ইবাদত ।
২)গায়রে মাতলু ঃ হাদীসকে ওয়াহীযে গায়রে মাতলু বলা হয়। যেহেতু হাদীস নামাজে তেলাওয়াত করা হয় না । কুরআন আল্লাহ তায়ালার মৌলিক জ্ঞান । আর হাদীস হল তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা হাদীসের ভাব ও মর্ম আল্লাহ তায়ালার কিন্তু ভাষা রাসূলের সাঃ নিজস্ব রাসূল সাঃ বলেন-আমাকে কুরআন দেওযা হয়েছে এবং তার সাথে অনুরূপ একটি বস্তু দেওয়া হয়েছে ।আর দ্বিতীয় বস্তুটি হল হাদীস বা সুন্নাহ।

৩)আল্লাহ ও রাসূলের মধ্যকার সকল কথপোকথনই কুরআন বা ওহি নয়। যেমন- রাসূলের পালক পুত্রের তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীকে আল্লাহর অনুমোদন ক্রমেই বিবাহ করেছিলেন, যা কুরআনে উল্লেখ নেই। দ্বিতীয়তঃ- রাসূল (সাঃ) একাদন তাঁর স্ত্রীদের কোন একজনের নিকট একটি একান্ত গোপন কথা বলেন। তিনি (স্ত্রী) তা অন্যদের কাছে ফাঁস করে দেন। রাসূল (সাঃ) এজন্য র্তাঁকে অভিযুক্ত করলে তিনি বললেন আপনি একথা কিভাবে জানলেন ? প্রতিউত্তরে রাসূল (সাঃ) বললেন মহাজ্ঞানী সর্ববিষয়ে জ্ঞাত আল্লাহই আমাকে জানিয়েছেন।

কুরআন নাযিলের পদ্ধতি : পবিত্র কুরআন দুটি পযার্য়ে অবতীর্ণ হয়।
প্রথম পর্যায়ঃ লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে লাইলাতুল ক্বাদারে পূর্ণ কুরআন এক সাথে নাযিল হয়।
বরকতময় রজনী লাইলাতুল ক্বাদারে কুরআন ’লাওহে মাহফুজ ’ থেকে দুনিয়ার আকাশে ’বায়তুল ইয্যাহ নামক স্থানে একসাথে নাযিল হয়। তার প্রমাণ সূরা ক্বাদার –
দ্বিতীয় পর্যায়ঃ দুনিয়ার আকাশ থেকে নবী করীম (সাঃ) এর অন্তরে নবুওয়াতের দীর্ঘ ২৩ বছর সময়ব্যাপী প্রয়োজন অনুপাতে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয় । এই সময়টাকে নবুওয়াতী জীবন বলে।( সূরা বনি ইসরাইল-১০৬)

ওয়াহী নাযিলের পদ্ধতি :
(ক) ফেরেস্তার মাধ্যমে ওয়াহীঃ যেমন-
* ঘন্টার ধ্বনি ন্যায় যখন ওয়াহী নাযিল হত তখন এই রকম আওয়াজ হত।
* সরাসরি হযরত জিব্রাইলকে (আঃ) প্রেরণের মাধ্যমে -অধিকাংশ সময় জিব্রাইল আঃ নিজে ওয়াহী নিয়ে আসতেন ।
* ফেরেস্তা মনুষ্য সুরতে আগমন – বেশীর ভাগ সময় হযরত দাহিয়াতুল কলবির সুরতে জিব্রাইল (আঃ) আসতেন।
* ফেরস্তার নিজ আকৃতিতে-জিব্রাইল (আঃ) আপন আকৃতিতে রাসূলের নিকট ওয়াহী নিয়ে আসতেন ।
* হযরত ইসরাফিল (আঃ) মাধ্যমে কখনো কখনো ওয়াহী অবতীর্ণ হত ।
* রাসূলের নবুয়াতের ২৩ বছরেরহযরত জিব্রাইল তার নিকট মোট ২৪,০০০ বার এসেছেন।
* রাসূল (সাঃ) তাকে ২৩ বছরে মোট ৩ বার নিজস্ব সুরতে দেখতে পান । যথাঃ-
১)হেরা গুহায় প্রথম ওয়াহী নিয়ে আগমন করার দিন ।
২)ফিতরাতুল ওয়াহী সময় : ওয়াহী বন্দ থাকাকালীন সময়ের মধ্যে একদিন তাকে আসমান হতে যমীন পযর্ন্ত বিরাট আকৃতিতে চেয়ারে বসা অবস্থায় ।
৩) মিরাজে : মিরাজের রাত্রিতে সিদরাতুল মুনতাহা নামক স্থানে দেখেন।

(খ)মাধ্যম ছাড়া ওয়াহী :
*সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে –
*জাগ্রত অবস্থায় পর্দার অন্তরাল থেকে ওযাহী প্রেরণ-
* রাসূলের সাঃ অন্তর এলহামের মাধ্যমে –
(আননাফচু ফির রুয়ী)
* সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলা ।যেমন মিরাজের রাত্রিতে। (সূরা শুরা -৫১) আরো বিস্তারিত পাওয়া যাবে ঃ- সাফফাত -১০২,ফাতির-২৭ আয়াত।
Share this:

ইসলামী বিপ্লবের স্বাভাবিক পদ্ধতি

ইসলামী বিপ্লবের স্বাভাবিক পদ্ধতি : এ.কে.এম. নাজির আহমদ

বিপ্লব মানে হচ্ছে সমাজ-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন।

ইসলামী বিপ্লব
সমাজ-ব্যবস্থার সকল স্তর, দিক ও বিভাগে ইসলামের বিধি-বিধান কার্যকর হওয়ার নাম ইসলামী বিপ্লব।
‘ইকামাতুদ্ দীন’, ‘ইযহারু দীনিল হাক’, ‘খিলাফাত প্রতিষ্ঠা’ ইত্যাদি পরিভাষা ‘ইসলামী বিপ্লব’ পরিভাষার সমার্থক। ইসলামী বিপ্লবের দুইটি শর্ত পূরণ হওয়া অত্যাবশ্যক। শর্ত দুইটি হচ্ছে :

ক. একদল যোগ্য ইসলামী ব্যক্তিত্বের উদ্ভব।
খ. ইসলামী গণ-ভিত্তি সৃষ্টি।

ইসলামী চিন্তা-চেতনা, ইসলামী মন-মানসিকতা ও ইসলামী চরিত্রসম্পন্ন ব্যক্তিকেই বলা হয় ইসলামী ব্যক্তিত্ব।একজন ইসলামী নৈতিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি যদি মৌলিক মানবীয় গুণেও সমৃদ্ধ হন, তিনি হন যোগ্য ইসলামী ব্যক্তিত্ব। ইসলামী বিপ্লব সাধনের জন্য এই ধরনের বহু সংখ্যক ব্যক্তির বিদ্যমানতা অত্যাবশ্যক। কোন ভূ-খণ্ডের জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশের ইসলামী চিন্তা-চেতনা, ইসলামী মন-মানসিকতা ও ইসলামী চরিত্রসম্পন্ন রূপে গড়ে ওঠার নাম ইসলামী গণ-ভিত্তি। এই গণ-ভিত্তি গড়ে না ওঠা পর্যন্ত কোন ভূ-খণ্ডে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হওয়া স্বাভাবিক নয়। আলকুরআনের সূরা আর রা‘দের ১১ নাম্বার আয়াত সেই কথারই ইংগিত দেয়। اِنَّ اللهَ لاَ يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتّى يُغَيِّرُوْا مَا بِاَنْفُسِهِمْ.
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন কাউমের অবস্থার পরিবর্তন ঘটান না যেই পর্যন্ত না তারা তাদের চিন্তা ও চরিত্রের পরিবর্তন ঘটায়।” নবী-রাসূলদের ব্যক্তি গঠন ও গণ-ভিত্তি সৃষ্টির প্রয়াস নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস্ সালাম) ইসলামী ব্যক্তি গঠন ও ইসলামী গণ-ভিত্তি সৃষ্টির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে তাঁরা যেমন ইসলামের মর্মকথা পৌঁছাবার চেষ্টা করেছেন, তেমনিভাবে চেষ্টা করেছেন সমাজের চালিকা শক্তি অর্থাৎ নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তিদের কাছে তা পৌঁছাবার জন্য।
সমাজের চালিকা শক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে অপরাপর মানুষের পক্ষে ইসলাম গ্রহণ করা সহজ হয়ে যায়। সেই জন্যই নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস্ সালাম) সমাজের চালিকা শক্তিকে বিশেষভাবে টার্গেট বানিয়ে ছিলেন। ইবরাহীম (আ) উর সাম্রাজ্যের সম্রাট নামরূদের কাছে এই উদ্দেশ্যেই ইসলামের মর্মকথা পৌঁছিয়েছিলেন। একই উদ্দেশ্যে মূসা ইবনু ইমরান (আ) মিসরের ফিরআউন মারনেপতাহ-র কাছে ইসলামের মর্মকথা তুলে ধরেছিলেন। ঠিক এই উদ্দেশ্যেই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলআরাবীয়ার শীর্ষ স্থানীয় নেতা আবু জাহল, উতবাহ ইবনু রাবীয়াহ, শাইবাহ ইবনু রাবীয়াহ, আলওয়ালীদ ইবনুল মুগীরাহ প্রমুখের কাছে ইসলামের মর্মকথা উপস্থাপন করেছিলেন।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যক্তি গঠন পদ্ধতি ইসলামী ব্যক্তি গঠনের জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন অস্বাভাবিক পদ্ধতি অবলম্বন করেননি। তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি ছিলো সহজ ও স্বাভাবিক। তদুপরি তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি ছিলো আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত। আলকুরআনের জ্ঞান বিতরণ এবং আলকুরআনের জ্ঞানের ভিত্তিতে চরিত্র গঠনের জন্য লোকদেরকে উদ্বুদ্ধকরণই ছিলো মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যক্তি গঠন পদ্ধতি। আলকুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৬৪ নাম্বার আয়াতে ও সূরা আল জুমু‘আর ২ নাম্বার আয়াতে يَتْلُوْا عَلَيْهِمْ ايتِه وَيُزَكِّيْهِمْ
(যাতে সে লোকদেরকে আয়াতগুলো পড়ে শুনায় এবং তাদের তাযকিয়া করে) এবং সূরা আল বাকারার ১৫১ নাম্বার আয়াতে يَتْلُوْا عَلَيْكُمْ ايتِناَ وَيُزَكِّيْكُمْ
(যাতে সে তোমাদেরকে আমার আয়াতগুলো পড়ে শুনায় এবং তোমাদের তাযকিয়া করে) বলে সেই পদ্ধতির কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আহ্বানে সাড়া দিয়ে যাঁরা মুমিন হতেন তাঁরাও সংগে সংগেই ইসলামের মুবাল্লিগ বা দা‘য়ী ইলাল্লাহ হয়ে যেতেন। তাঁরাও আলকুরআনের জ্ঞান বিতরণ এবং আলকুরআনের জ্ঞানের ভিত্তিতে চরিত্র গঠনের জন্য লোকদেরকে উদ্বুদ্ধকরণের কাজে আত্মনিয়োগ করতেন।মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিপ্লব সাধনের জন্য অস্ত্র ব্যবহার করেননি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবির্ভাবকালে আলআরাবীয়ার প্রত্যেক ব্যক্তি নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র বহন করতো। অর্থাৎ তখন অস্ত্র রাখা ও অস্ত্র বহন করা বৈধ ছিলো।
আবু জাহল ও তার অনুসারীদের হাতে যেমন তলোয়ার, বল্লম ও তীর ছিলো, তেমনিভাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাথীদের হাতে তলোয়ার, বল্লম ও তীর ছিলো। উভয় পক্ষের অস্ত্রের মান ছিলো সমান। ইসলামী ব্যক্তি গঠন ও গণ-ভিত্তি রচনার প্রয়াস চালাতে গিয়ে মাক্কায় অবস্থান কালের তেরোটি বছর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাথীরা নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন।
মুশরিকদের হামলায় হারিছ ইবনু আবী হালাহ (রা), ইয়াসির (রা), সুমাইয়া (রা) ও আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াসির (রা) শাহাদাত বরণ করেন। অনেকেই হন আহত। কিন্তু বৈধ অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাথীরা এই যুল্মের প্রতিকারের জন্য অস্ত্র ব্যবহার করেননি। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ ছিলো “কুফ্ফু আইদিয়াকুম” (তোমাদের হাত গুটিয়ে রাখ) অর্থাৎ অস্ত্র ব্যবহার করো না। এই নির্দেশ এসেছিলো ওহী গায়রে মাতলূ-র মাধ্যমে। পরবর্তী কালে সূরা আন্ নিসার ৭৭ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন এই বিষয়টি উল্লেখ করেন। ইসলাম-বৈরী শক্তি হামলার পর হামলা চালাতে থাকে। আর আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বিভিন্ন সূরা নাযিল করে মুমিনদেরকে বার বার ছবর অবলম্বন করার তাকিদ দিতে থাকেন। উল্লেখ্য যে, ছবরের বহুবিধ অর্থের কয়েকটি হচ্ছে নিজের আবেগ সংযত রাখা, রাগের বশবর্তী হয়ে কোন কাজ না করা, বিপদ-আপদে ঘাবড়ে না যাওয়া, ত্বরা-প্রবণতা পরিহার করা, কাংখিত ফল পেতে দেরি দেখে অস্থির না হওয়া, অশোভন আচরণে উত্তেজিত না হওয়া, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজের কর্তব্যে অবিচল থাকা। আরো উল্লেখ্য যে, কোন নবীই ইসলামী বিপ্লব সাধনের জন্য সশস্ত্র তৎপরতা চালাননি। আর নবীরা তো আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের ইচ্ছারই প্রতিনিধিত্ব করতেন।
একদল মুমিন অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চেয়েও অনুমতি পাননি প্রতি বছর আলআরাবীয়ার উকায নামক স্থানে যুল কা‘দাহ মাসের ১ তারিখ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত মেলা অনুষ্ঠিত হতো। দূর-দূরান্ত থেকে আগত হাজার হাজার মানুষ বিশ দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে ভালো-মন্দ বহু প্রকারের কর্মকাণ্ড করতো। অতঃপর তারা যুল কা‘দাহ মাসের ২১ তারিখ যুলমাজান্না নামক স্থানে এসে অবস্থান গ্রহণ করতো। এখানে তারা থাকতো দশ দিন। এর পর তারা যুলমাজায নামক স্থানে এসে তাঁবু গাড়তো। তারা এখানে অবস্থান করতো যুলহিজ্জা মাসের ১ তারিখ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত।
অতঃপর তারা যুলহিজ্জা মাসের ৮ তারিখে মিনাতে অবস্থান গ্রহণ করতো। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকদের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছাবার জন্য এই মেলাগুলোতে যেতেন এবং সময় সুযোগ বুঝে তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে লোকদের সাথে আলাপ করতেন, তাদেরকে আলকুরআনের আয়াত পড়ে শুনাতেন এবং আলকুআনের ভিত্তিতে জীবন গড়ে তোলার আহ্বান জানাতেন। নবুওয়াতের দশম সনে মিনারই একটি পার্বত্য খণ্ড আকাবাতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছয় জন ইয়াসরিববাসীর (মাদীনাবাসীর) সাথে আলাপ করেন। তাঁরা ইসলামের দা‘ওয়াত কবুল করেন।
নবুওয়াতের একাদশ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ আকাবাতেই ইয়াসরিব থেকে আগত বারো জন ব্যক্তির সাথে আলাপ করেন। তাঁরা মনে প্রাণে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সর্বাবস্থায় ইসলামের ওপর অবিচল থাকার অংগীকার করেন। এই ঘটনাকেই বলা হয় প্রথম বাই‘আতে আকাবা।
নবুওয়াতের দ্বাদশ সনে ৭৫ জন ইয়াসরিববাসী আকাবাতে গভীর রাতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে মিলিত হন। তাঁরা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার শপথ নেন। এই ঘটনাটিকে বলা হয় দ্বিতীয় বাই‘আতে আকাবা।এই সময় ইয়াসরিববাসীরা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাথীদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের কথা জানতে পেরে তাঁকে ইয়াসরিবে (মাদীনায়) হিজরাত করার আহ্বান জানান।
আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে ইয়াসরিববাসীদের পক্ষ থেকে মিনাতে সমবেত যালিম মুশরিকদের ওপর হামলা চালাবার অনুমতি চাওয়া হয়। ইয়াসরিববাসীদের অন্যতম লড়াকু ব্যক্তি আব্বাস ইবনু উবাদাহ ইবনু নাদলা (রা) বলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, যেই আল্লাহ আপনাকে সত্য জীবন-বিধানসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ করে বলছি, আপনি চাইলে আমরা আগামীকালই মিনায় অবস্থানকারীদের ওপর হামলা চালাবো।” মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “আমাকে এইরূপ কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তোমরা নিজ নিজ কাফিলায় ফিরে যাও।”
দ্রষ্টব্য : সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা-১২০
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি লাভ নবুওয়াতের ত্রয়োদশ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের পক্ষ থেকে হিজরাতের অনুমতি লাভ করেন। ছোট ছোট গ্র“পে বিভক্ত হয়ে নিরবে মাক্কা ত্যাগ করে তাঁর সাথীরা ইয়াসরিব হিজরাত করেন। শেষের দিকে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবু বাকর আছ্ ছিদ্দিককে (রা) সাথে নিয়ে হিজরাত করেন।
মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইয়াসরিব আসার পর এর নাম হয় মাদীনার্তু রাসূল। মাদীনা একটি রাষ্ট্রের রূপ লাভ করে। আর নব-গঠিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। ২৫ থেকে ৭৮ নাম্বার আয়াত।
আর এই অংশটির একাংশে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাথীদেরকে অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেন।
اُذِنَ لِلَّذِيْنَ يُقَاتَلُوْنَ بِاَنَّهُمْ ظُلِمُوْا ط وَاِنَّ اللهَ عَلى نَصْرِهِمْ لَقَدِيْرٌ ০نِ الَّذِيْنَ اُخْرِجُوْا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٍّ اِلاَّ اَنْ يَقُوْلُوْا رَبُّنَا اللهُ ط …
সূরা আলহাজ ॥ ৩৯, ৪০
“লড়াইয়ের অনুমতি দেওয়া হলো তাদেরকে যাদের প্রতি যুল্ম করা হয়েছে, আর আল্লাহ অবশ্যই তাদেরকে সাহায্য করার ক্ষমতা রাখেন, যাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে শুধু এই জন্য যে, তারা বলেছিলো : আল্লাহ আমাদের রব।” অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ
সূরা আলহাজের ৩৯ ও ৪০ নাম্বার আয়াতে অস্ত্র ব্যবহারের ‘অনুমতি’ দেওয়া হয়েছে। আর সূরা আলবাকারাহর ১৯০ নাম্বার আয়াতে দেওয়া হয়েছে অস্ত্র ব্যবহারের ‘নির্দেশ’।
وَقَاتِلُوْا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ الَّذِيْنَ يُقَاتِلُوْنَكُمْ وَلاَ تَعْتَدُوْا ط اِنَّ اللهَ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِيْنَ সূরা আলবাকারাহ ॥ ১৯০ “আর তোমরা আল্লাহর পথে তাদের সাথে লড়াই কর যারা তোমাদের সাথে লড়াই করে, কিন্তু বাড়াবাড়ি করো না। যারা বাড়াবাড়ি করে আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন না।” “অনুমতি’ ও ‘নির্দেশ’ দেওয়ার মধ্যে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধান। আমাদের অনুসন্ধান অনুযায়ী ‘অনুমতি’ দেওয়া হয় হিজরী প্রথম সনের যুলহিজ্জা মাসে এবং ‘নির্দেশ’ নাযিল হয় হিজরী দ্বিতীয় সনের রজব কিংবা শা‘বান মাসে।”
দ্রষ্টব্য : তাফহীমুল কুরআন, সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী, সূরা আলহাজের তাফসীরের ৭৮ নাম্বার টীকা।

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগের ও পরের কর্ম-পদ্ধতি
ক. ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহ) বলেন, “ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় মহানবীর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি কেবল ইসলামী দা‘ওয়াত পৌঁছানোর আদেশ ছিলো, জিহাদের (যুদ্ধের) অনুমতি দেওয়া হয়নি। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি যখন মাদীনায় হিজরাত করলেন এবং সেখানে ইসলামের দুশমনেরা তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেলো তখন আল্লাহ তা‘আলা মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীদেরকে জিহাদের (যুদ্ধের) অনুমতি দান করেন।”
দ্রষ্টব্য : আস্ সিয়াসাতুশ্ শারইয়াহ, ইমাম ইবনু তাইমিয়া, পৃষ্ঠা-২০৩
খ. ইমাম ইবনুল কাইয়েম (রহ) বলেন, “এইভাবে প্রায় তের বছরকাল পর্যন্ত তিনি তাবলীগের মাধ্যমে মানুষের মনে আল্লাহ-ভীতি সৃষ্টির প্রয়াস পান। এই সময় তিনি কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি এবং কাউকে জিয্ইয়া দিতেও বলেননি। বরং ঐ সময় হাত গুটিয়ে রাখা, ধৈর্য ধারণ করা এবং সহনশীলতার পথ অবলম্বন করার জন্যই তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তারপর তিনি হিজরাতের নির্দেশ লাভ করেন। হিজরাতের পর সশস্ত্র সংগ্রামের অনুমতি দেওয়া হয়। তারপর যারা রাসূলের (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ (যুদ্ধ) করার এবং যারা নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে তাদের ওপর হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। পরবর্তীকালে আল্লাহর দীন পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দেওয়া হয়।”
দ্রষ্টব্য : যাদুল মা‘আদ, হাফিয ইবনুল কাইয়েম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭১
গ. সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী (রহ) বলেন, “এর আগে মুসলিমরা যদ্দিন দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন ছিলো তাদেরকে কেবল ইসলাম প্রচারের হুকুম দেওয়া হয়েছিলো এবং বিপক্ষের যুল্ম-নির্যাতনে ছবর অবলম্বন করার তাকিদ করা হচ্ছিলো। এখন মাদীনায় তাদের একটি ছোট্ট স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর এই প্রথমবার তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে : যারাই এই সংস্কারমূলক দা‘ওয়াতের পথে সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করে অস্ত্র দিয়েই তাদের অস্ত্রের জবাব দাও।”
দ্রষ্টব্য : তাফহীমুল কুরআন, সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী, সূরা আলবাকারার তাফসীরের ২০০ নাম্বার টীকা।
আরো উল্লেখ্য যে, আলমাদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একবছর পর মাক্কার মুশরিকগণ এই নব গঠিত রাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। তিনগুণ বেশি শক্তিশালী মুশরিক বাহিনীর ওপর মুসলিমগণ বিজয় লাভ করেন বদর প্রান্তরে আল্লাহর মহা অনুগ্রহে।
আল্লাহ ভালো করেই জানতেন যে অ-মুসলিম শক্তি এই পরাজয় মেনে নিয়ে শত্র“তা বন্ধ করে দেবে না। বরং আরো বেশি সামরিক শক্তি যোগাড় করে আবারও আক্রমণ চালাবার জন্য এগিয়ে আসবে। এই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন নাযিল করেন সূরা আলআনফাল। এই সূরার একাংশে তিনি ইসলামী রাষ্ট্র আলমাদীনার কর্ণধারদেরকে প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি অর্জনের নির্দেশ প্রদান করেন।
আল্লাহ বলেন,
وَاَعِدُّوْا لَهُمْ مَّااسْتَطَعْتُمْ مِّنْ قُوَّةٍ. সূরা আল আনফাল ॥ ৬০
“তাদের মুকাবিলার জন্য তোমরা যতো বেশি সম্ভব শক্তি সঞ্চয় কর।”
ইসলামী আন্দোলনের স্বাভাবিক বর্ধন
ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর নবী-রাসূলগণ অত্যন্ত স্বাভাবিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। প্রধানত মানুষের চিন্তাধারায় পরিবর্তন সাধনের দিকে লক্ষ্য রেখেই তাঁরা তাঁদের প্রয়াস চালিয়েছেন। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহও (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিরলসভাবে চালিয়ে গেছেন ‘আদ্ দাওয়াতু ইলাল্লাহ’র কাজ। আর তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছেন মাক্কার সত্য-সন্ধানী ও সাহসী একদল যুবক-যুবতী। তিনি এঁদেরকে সংঘবদ্ধ করে ও প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্ব ইসলামী ব্যক্তিত্ব-রূপে গড়ে তোলেন।
নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের প্রায় অধিকাংশ ইসলাম-বিরোধী হওয়ায় মাক্কাবাসীরা গণ-হারে তাঁর আহ্বানে সাড়া দিতে পারেনি। ফলে মাক্কায় গড়ে ওঠেনি ইসলামী গণ-ভিত্তি। পক্ষান্তরে ইয়াসরিবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অধিকাংশ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর প্রতি সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়ান। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করায় সাধারণ মানুষের ইসলাম গ্রহণ করা সহজ হয়ে যায়। ফলে দারুণ উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এগিয়ে আসে ইয়াসরিবের বিপুল সংখ্যক মানুষ। গড়ে ওঠে ইসলামী ভাবধারা পুষ্ট গণ-ভিত্তি, ইসলামী সমাজ-সভ্যতা-সংস্কৃতি বিনির্মাণের বুনিয়াদ।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম ও সরকার গঠনের সংগ্রাম একটির পর একটি স্তর অতিক্রম করে সামনে এগিয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন আলকুরআনের সূরা আলফাত্হে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিচালিত সংগ্রামের স্বাভাবিক বর্ধনের একটি চমৎকার উপমা পেশ করেছেন।
আল্লাহ বলেন,
كَزَرْعٍ اَخْرَجَ شَطْئَه فَازَرَه فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوى عَلى سُوْقِه.
সূরা আল ফাতহ ॥ ২৯
“এ এমন এক কৃষি যা অংকুর বের করলো, অতপর শক্তি সঞ্চয় করলো, অতপর মোটা-তাজা হলো এবং অবশেষে নিজ কাণ্ডের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে গেলো।”
এই আয়াতাংশে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিচালিত আন্দোলনের ক্রমবিকাশ ও প্রতিষ্ঠা লাভের চারটি স্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যথা :
১. অংকুর বের করা,
২. শক্তি সঞ্চয় করা,
৩. মোটা-তাজা হওয়া,
৪. কাণ্ডের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া।
‘অংকুর বের করা’র অর্থ হচ্ছে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সূচনাকরণ।
‘শক্তি সঞ্চয় করা’র অর্থ হচ্ছে আহ্বানে সাড়া দানকারী ব্যক্তিদেরকে সংঘবদ্ধ ও সংশোধিত করে সাংগঠনিক শক্তি অর্জন।
‘মোটা-তাজা হওয়া’র অর্থ হচ্ছে কর্ম-এলাকার সর্বত্র প্রভাব সৃষ্টি ও গণ-মানুষের সমর্থন লাভ। আর গণ-মানুষের সমর্থন লাভেরই আরেক নাম গণ-ভিত্তি অর্জন।
‘কাণ্ডের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া’র অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন।
প্রকৃতপক্ষে, এটাই হচ্ছে ইসলামী বিপ্লবের স্বাভাবিক পদ্ধতি।

উপসংহার
মুমিনদের জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হচ্ছেন ‘উসওয়াতুন হাসানা’ (সর্বোত্তম উদাহরণ)। ‘উসওয়াতুন হাসানা’।
সাধন তথা আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রেও তিনিই ‘উসওয়াতুন হাসানা’।
আরো উল্লেখ্য যে, আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন এই ‘উসওয়াতুন হাসানা’র অনুসরণকেই তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার শর্ত বানিয়েছেন।

দারসুল হাদীস : ঈমানের প্রকৃত স্বাদ গ্রহণের উপায়

অনুবাদ : “হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মোত্তালিব (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালাকে রব, ইসলামকে জীবনবিধান ও মুহাম্মদ (সা)-কে রাসূল হিসেবে শুধু ঈমান আনেনি বরং মনে প্রাণে গ্রহণ করেছেন ও সন্তুষ্ট হয়েছেন, তিনি ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

পটভূমি

বিদায় হজে আরাফাতের মাঠে নবীজি (সা) যে ঐতিহাসিক বক্তব্য রেখেছেন তার প্রতিটি শব্দ মানবতার জন্য একটি সোনালি দলিল। তাতে তিনি বলেন, “আমি তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি দু’টি অমূল্য বস্তু। যতদিন তোমরা তা শক্ত করে ধারণ করবে ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না, গোমরাহিতে হারিয়ে যাবে না। একটি আল্লাহর কিতাব অপরটি সুন্নাতে রাসূল (সা)।” এ সুন্নাতে রাসূলের (সা) উৎস হচ্ছে হাদিসে নববীর মহা সরোবর। এ হাদিসের আলো ব্যতিরেকে কুরআনের হিদায়াত গ্রহণ সম্ভব নয়। উম্মাহর রাহবার যাঁরা তাদেরকে কুরআনুল কারিম ও হাদিসে রাসূল (সা)-কে সমান গুরুত্বের সাথে অধ্যয়ন করতে হবে।

আলোচিত হাদিসের উৎস

সনদের বিবেচনায় ইমাম বুখারী তাকে ‘মরফু হাদিস’ বলে গ্রহণ করেছেন। যেহেতু রাবী হাদিসটি মুহাম্মদ (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন, আর হাদিসের সনদ মুত্তাসীল সেহেতু নবীয়ে কারিম (সা) থেকে গ্রন্থাবদ্ধ হওয়া পর্যন্ত কোনো রাবী ধারাবাহিকতা থেকে বাদ যায়নি। বিশুদ্ধতার বিচারে বর্ণিত হাদিসটিকে প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত বলে গ্রহণ করা যায়। ইমাম বুখারী (রহ) ও ইমাম মুসলিম (রহ) উভয়ে তাদের সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে হাদিসটি বিশুদ্ধ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

হাদিসের প্রথম রাবী

হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রা)। তিনি রাসূলে কারিমের প্রিয় চাচা। বয়সে নবীয়ে কারিম (সা) থেকে ২-৩ বছরের বড়। তিনি কুরাইশদের প্রতাপশালী ব্যক্তিদের একজন। তিনি আবদুল মোত্তালিবের পর কাবার রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্ব হতে তিনি মুহাম্মদের (সা) অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী ছিলেন।
আকাবার বায়াতের অনুষ্ঠানে ছিলেন ৭২ জন মদীনাবাসী আনসার। অনুষ্ঠান চলছিল নিশীথ রাতে, হজের মৌসুমে ও মুজদালিফার পাহাড়ে। সে সময় খঞ্জর হাতে এক জন সাহসী ব্যক্তি নবীয়ে করিমের (সা) এর পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। ঈমান না এনেও ঐতিহাসিক এ দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিটি আব্বাস ইবনে আব্দুল মোত্তালিব।
মক্কার কুরাইশদের চাপে তিনি বাধ্য হয়ে বদরের যুদ্ধে অংশ নেন ও মুশরিকদের সাথে বন্দী হয়ে মদীনায় আসেন। শক্তভাবে বাঁধনের কারণে তিনি রাতে কাঁতরাতে থাকেন। তাঁর কষ্টে রাসূলুল্লাহ (সা) ঘুমাতে পারছিলেন না, তিনি নির্দেশ দেন, “আমার চাচা আব্বাসসহ সকল বন্দীর বাঁধন হালকা করে দাও ও তাদেরকে বস্ত্র দাও।” ঘটনাচক্রে দীর্ঘদেহী আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে যিনি গায়ের জামা দিয়েছিলেন তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই।
যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। হযরতের চাচা এত বেশি অর্থ প্রদানে অক্ষমতা প্রকাশ করলে নবীজি (সা) বলেন, “আপনি উম্মুল ফজলের নিকট যে অর্থ ও স্বর্ণ রেখে এসেছেন তা থেকে দিন।”
বিম্ময়ের সাথে হযরত আব্বাস বলে উঠলেন, আল্লাহর শপথ, উম্মুল ফজলের নিকট গচ্ছিত অর্থের বিষয় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি ঘোষণা দিচ্ছি, “নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল।”
তিনি মক্কায় থাকা অবস্থায় কাফেরদের গতিবিধি রাসূল (সা)-কে অবহিত করতেন ও নির্যাতিত মুসলমানদের যথাসাধ্য আশ্রয় দিতেন। মক্কা বিজয়ের কিছু দিন পর তিনি সপরিবারে মদীনায় হিজরত করেন। মক্কা বিজয়ের যুদ্ধে অংশ নেন। হোনায়নের যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে একটি বাহনে আরোহী ছিলেন। হাওায়াজীন গোত্রের তীরন্দাজদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে বিক্ষিপ্ত মুসলমানরা দিগি¦দিক হারিয়ে ফেলেছিলেন। নবীজি (সা) তাঁর চাচা আব্বাস (রা)-কে কঠিনভাবে আওয়াজ দেয়ার নির্দেশ দিলে তিনি গর্জন করে বলতে থাকেন : “আইনা আসহাবুস সুমরা”- তীরন্দাজরা কোথায়! যা যুদ্ধের গতিকে বদলিয়ে দিয়েছিল।
হযরত আব্বাস (রা) ৩২ হিজরির রজব মাসে ৮৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। হযরত উসমান (রা) তাঁর জানাজার ইমামতি করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) তাঁর সম্মানিত পিতার লাশ কবরে রাখেন। মদীনা শরীফের জান্নাতুল বাকীর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

হাদিস শরীফের তাফসীর

‘ঈমানের প্রকৃত স্বাদ’ বলতে আমরা কী বুঝি?
ইসলামের বিশাল প্রাসাদ ঈমানের বুনিয়াদের ওপর এভাবে দাঁড়িয়ে আছে, বিশাল বটবৃক্ষ যেমন তার মূল ও শিকড়ের ওপর দণ্ডায়মান। ইসলামের বিস্তৃত শাখা প্রশাখা তথা যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে এক পাল্লায় রাখলে যে ওজন ও মূল্য বহন করে, ঈমান একাই সব কিছুর চেয়ে বেশি ভারী ও বেশি মূল্য বহন করে। এই ঈমান গ্রহণকারী একজন কৃতদাস ও তাঁর আল্লাহর নিকট সমগ্র পৃথিবী বিখ্যাত কোন রাজা মহারাজা সম্পদের মালিক এর চেয়ে অনেক বেশি বা অনেক মূল্যবান। যে ঈমানই একজন কাফির জাহান্নামীকে জান্নাতের অন্তর্ভুক্ত করবে। একজন ব্যক্তির চূড়ান্ত সফলতা ও বিফলতা প্রকৃতপক্ষে ঈমানের ওপর ফয়সালা হয়। নবীদের দাওয়াতের মূল বিষয় ঈমান। আল্লাহতায়ালার নিকট থেকে তাঁর সকল অহি ও কিতাবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ঈমান। এ ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত না হলে ব্যক্তি কোনো নেক আমলের কোনো মূল্য বহন করে না। এ ঈমানই ব্যক্তিকে আল্লাহতালার প্রিয়জন বানায়। তার জীবনের নিরাপত্তা সম্মান আল্লাহর জিম্মায় থাকে। পৃথিবীর সমস্ত শয়তানি শক্তি ঈমানের শত্রু। মুমিনের কারণে পৃথিবীর জীবনে শতশত কারবালা সৃষ্টি হয়েছে। কুরআন সাক্ষ্য দিয়ে বলছে তাদের ওপর অত্যাচার ও জুলুমের কারণ ঈমান ছাড়া আর কিছুই ছিল নাÑ “শপথ দুর্গময় আকাশমণ্ডলীর। সে কঠিন দিনের, যে দিবসের ওয়াদা করা হয়েছে। শপথ তাদের যারা কিয়ামতকে অবলোকন করবে আর তার শপথ সে কঠিন দিবসে যা কিছু দেখানো হবে। ধ্বংস তাদের জন্য যারা বিশ্বাসীদেরকে আগুনে পুড়ে মারার জন্য গর্ত খনন করছিল তাতে প্রজ্বলিত করল দাউ দাউ অনল। মুমিনদের নিক্ষেপ করা হচ্ছিল সে প্রজ্বলিত অনলকুণ্ডে আর তারা সে গর্তের মুখে তামাশা দেখছিল। ঈমানদারদের ওপর নিষ্ঠুর আচরণের একটিই কারণ, তারা তো মহান পরাক্রমশালী আল্লাহতায়ালা যিনি সপ্রশংসিত সে মহান প্রভুর ওপর বিশ্বাস ছাড়া আর কোনো অপরাধ করেনি।” (সূরা বুরুজ : ১-৪)
উপরের আয়াতগুলোতে ঈমানের কারণে নির্যাতনের একটি জীবন্ত চিত্র আল্লাহর অহিতে অঙ্কিত হয়েছে। কুরআনুল কারিম বিভিন্ন সূরায় অনুরূপ চিত্র আরও মর্মস্পর্শীভাবেও এঁকেছেন। এগুলো কোনো সাহিত্যিকের কল্পনার বুনুনকর্ম নয়। এগুলো মহাকালে ঘটে যাওয়া মহাসত্যের মহাদলিল।
আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হচ্ছে এত নিযার্তন, এত নিষ্ঠুরতা, এত লোমহর্ষক বর্বরতা সহ্য করে ঈমানের ওপর অটল ও দৃঢ়কদমে দাঁড়িয়ে থাকতে কিসে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল? শরীরের এক একটি অংশ বিচ্ছেদ করার পর, হাড্ডি থেকে গোশতকে লোহার চিরুনি দিয়ে তুলে নেয়ার পরও তাদের কলিজা থেকে ঈমানকে পৃথক করা যায়নি। এটি সহজ বিষয় নয়। জ্বলন্ত কয়লার ওপর জীবন্ত বেলালকে শুইয়ে পাথর চাপা দেয়া হয়েছে শরীরের চর্বি গলে গলে কয়লা দেহে ঢুকে পড়েছে, রক্ত ও চর্বিতে আগুন নিভে গিয়েছে। সে মর্মান্তিক মুহূর্তেও হযরত বেলাল (রা) ঈমান থেকে এক তিল পরিমাণ দূরে সরেননি। অচেতন অবস্থায় তিনি অস্পষ্ট স্বরে বলছিলেন, ‘আহাদুন আহাদুন’। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা সাহাবীদের ও পরবর্তীদের জীবনে রয়েছে ও গ্রন্থাবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু সে মজলুম মুসলমানেরা ঈমানের মধ্যে কী রহস্যজনক এক মজা খুঁজে পেয়েছিলেন। পার্থিব কোনো আনন্দ বা অসহ্য কোন যাতনা তাদেরকে ঈমানের স্বাদ আস্বাধনে এক মুহূর্তের জন্য বিরত রাখতে পারেনি। তাদের ঈমানের ওপর দৃঢ়তা পৃথিবীর সকল আশ্চর্যকে হার মানায়, সকল হৃদয়কে হতবাক করে, সকল জবানকে ভাষাহীন করে দেয়। অমানবিক অত্যাচার ও জুলুমের হাজার ক্ষত নিজ দেহে ধারণ করে সহাস্য বদনে বিপ্লবীদের নয়ন নিধি সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ ফাঁসির রজ্জু পরানোর সময় নিজ হাতে তা পরেছিলেন। অগণিত সাংবাদিকের ক্যামেরা চঞ্চল হলেও সে দৃশ্যে তারা সকলে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, “জীবন ও মৃত্যুর রহস্য সম্পর্কে তোমরা আজও অজ্ঞতার অন্ধকারে। এ রোমঞ্চকর মুহূর্তটির জন্য আমি অবর্ণনীয় জুলুম বরদাশত করে আসছি বছরের পর বছর।”
আমরা যারা ঈমানদার বলে নিজেদেরকে ঘোষণা দিয়েছি আমরা কি তাদের মতো ঈমানের স্বাদ ও মজা পেয়েছি? আল্লাহতায়ালা তাদের মতো ঈমান আনার আহবান করেছেন কুরআনে পাকে এভাবে- “যখন তাদেরকে বলা হলো, আর সব লোক যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সে সব লোকের মতো ত্যাগ কুরবানির সাথে ঈমান আন। তারা বলে আমরা কি বোকাদের মতো ঈমান আনব? হায়, এরা যে প্রকৃতপক্ষে বোকা সে ব্যাপারে তারা অজ্ঞতার তিমিরে।” (সূরা বাকারা : ১৩)
আমাদেরকে তাদের মতোই ঈমান আনতে হবে, আল্লাহতায়ালা যাদের ঈমান কবুল করেছেন। মুখে কতগুলো বুলি আর ঈমানের কথাসমূহ উচ্চারণের নাম প্রকৃত ঈমান নয়। আমাদেরকে সে লোকদের মত ঈমান আনতে হবে যাদের মাথার ওপর করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ডিত করার পরও ঈমান অখণ্ড ছিল। এক চুল পরিমাণ বিশ্বাস টলেনি যাদের। তাদের ঈমান সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) বলেন- “তাদের ক্বালবের জমিনের ওপর ঈমানের পাহাড় অটলভাবে দাঁড়িয়েছিল।” আলোচ্য হাদিসের মধ্যে নবীয়ে করীম (সা) ঐ ঈমান কিভাবে হাসিল সম্ভব তা বলেছেন।

তিনি বলেছেন, সে দুর্বল ঈমান লাভের ও তার রহস্যপূর্ণ ও অমৃতের স্বাদ গ্রহণের তিনটি শর্ত:
নিম্নে হাদিসের আলোকে তা বর্ণিত হলো-
১. আল্লাহতায়ালই এক মাত্র ‘রব’। যিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন আল্লাহকে রব হিসেবে। এ ‘রব’ শব্দটি কুরআনে পাকে গুরুত্বের সাথে ও বহুমাত্রিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে :
ক. প্রতিপালক অর্থে : “প্রশংসা শুধু আল্লাহতায়ালার জন্য যিনি সারা জাহানের পালনকর্তা।” (সূরা ফাতিহা : ১)
খ. মালিক ও মনিব অর্থে : “তিনি তোমাদের প্রভু। তাঁরই নিকট তোমাদের ফিরে যেতে হবে।” (সূরা হুদ : ৩৪)
গ. যার আনুগত্য করা হয় সে অর্থে : “তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও আনুগত্যের হকদার বানাবে না।” (সূরা আলে ইমরান : ৬৩)
ঘ. জিম্মাদার ও তত্ত্বাবধায়ক অর্থে : “ইউসুফ (আ) বলেন, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই! তিনি আমার রব যিনি আমাকে ভালো রেখেছেন।” (সূরা ইউসুফ : ২৩)

রব হিসেবে আল্লাহতায়ালাকে গ্রহণ করার অর্থ তিনি একমাত্র প্রতিপালক, তিনি মালিক ও প্রভু তিনি তত্ত্বাবধানকারী ও তিনি একমাত্র আনুগত্য পাওয়ার হকদার। রবুবিয়াতের পূর্ণ ব্যাখ্যা সহকারে ঈমান আনা একান্ত জরুরি। পৃথিবী বিপর্যয় সৃষ্টিকারী শক্তিগুলো যুগে যুগে নিজদেরকে “আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ রব” বলে দাবি করেছে। অগণিত মানব তাদের রবুবিয়াত মেনেও নিচ্ছে। আজকের বিশ্বে নিজদেরকে যারা ঝঁঢ়বৎ ঢ়ড়বিৎ; ঃযব সরমযঃবংঃ সধহ ড়ভ ঃযব যিড়ষব ড়িৎষফ ঘোষণা দিয়ে পৃথিবীর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বলছে লালন ও পালনকারী সেজে আর বিশ্ববাসীর আনুগত্য ও বশ্যতা দাবি করছে। এরাই ফেরাউন ও নমরুদের উত্তরসূরি। নবীগণ এদের মত সকল তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে সংঘাতে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিলেন এদের মিথ্যা রবুবিয়াতের তখত তাউস। ঈমানের স্বাদ যারা পেয়েছিলেন যে মানুষগুলো আল্লাহতায়ালাকে রব বলে শুধু ঘোষণা দেননি বরং তাতে সন্তুষ্ট চিত্ত ছিলেন। তারা তাদের জীবন যাপনের ওপর উপকরণের জন্য দিনের পর দিন উপবাস থেকে একমাত্র মহান প্রভুর নিকট হাত পেতেছেন। শত্রুর হাতে বন্দী হয়েও ফাঁসির রজ্জু গলায় পরার মুহূর্তেও তাঁরা জীবন ভিক্ষা চাননি জালেমের কাছে। আল্লাহর ওপর ঈমানের কসম খেয়ে শির উঁচু করে ঘোষণা দিয়েছিলেন- “হায়াত আওর মাউত কি ফায়সালা জমিন পর নেহি, উয় আসমান পর হোতা হ্যায়।”
তাই নবীজি (সা)-এর হাদিস এই পয়গাম নিয়ে এসেছে- আল্লাহতায়ালার রবুবিয়াতের ওপর যারা সন্তুষ্ট তারা আলোতে অন্ধকারে, জীবনে-মরণে, সুখে-দুঃখে, হাসি-কান্নায়, আল্লাহতে রাজি থাকবে। এক লহমার জন্যও নিরাশ হবে না, কান দেবে না কারো আশ্বাসে বা কারো হুমকিতে। তবেই তারা ইমানের স্বাদ খুঁজে পাবে।

২. দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে : “ইসলামী জীবন বিধান গ্রহণ করে তারা পরিতৃপ্ত ও সন্তুষ্ট”।
তারা ইসলামকে আনুষ্ঠানিক একটি সাধারণ ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেনি বরং গ্রহণ করেছেন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে। ইসলাম প্রচলিত অর্থে কোন ধর্ম নয়। ওংষধস রং ধ পড়সঢ়ষবঃব পড়সঢ়ৎবযবহংরাব ধহফ ৎধঃরড়হধষ পড়ফব ড়ভ ষরভব. তা পূর্ণাঙ্গ বিস্তৃতি ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি জীবনবিধান।

কুরআনুল করিমে এ দীন শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে :

ক. জীবনবিধান অর্থে দ্বীন : “তারা কি আল্লাহরতায়ালার তৈরি বিধান ছাড়া অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা তালাশ করছে, অথচ আকাশ ও জমিনের সবকিছু ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আল্লাহতায়ালার কানুনের নিকট আত্মসমর্পণ করছে এবং তারই নিকট সবাইকে ফিরে যেতে হবে। (সূরা আলে ইমরান : ৮৩)
খ. আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ অর্থে দ্বীন : “সাবধান! আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর জন্য।” (সূরা জুমার : ৩)
গ. সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব অর্থে দ্বীন : “হুকুম দেয়ার অধিকার আল্লাহ ছাড়া কারো নেই। তাঁর নির্দেশ তিনি ব্যতীত কারো দাসত্ব গ্রহণ করা যাবে না। আর এটাই সঠিক দ্বীন।” (সূরা ইউসুফ : ৪০)
ঘ. প্রতিফল দিবস তথা সফলতার ও ব্যর্থতার চূড়ান্ত ফায়সালা অর্থে দ্বীন : “যিনি প্রতিফল দিবসের মালিক।” (সূরা ফাতিহা : ৩)

উপরের আয়াতসমূহ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি, মানুষের জীবন চলার বিধান সার্বভৌমত্ব, আনুগত্য ও উপাসনা ও বন্দেগির সকল পর্যায় এ শব্দের ব্যাপকতার মধ্যে নিহিত রয়েছে। আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন শুধু একটি- ইসলাম। তিনি জীবনের কোনো অংশে ইসলামী বিধান ছাড়া আর কোনো আচরণ বা পদ্ধতির সামান্য অংশও গ্রহণ করবেন না। “আল্লাহর নিকট ইসলামই হচ্ছে একমাত্র মকবুল দ্বীন।”
দ্বীন হিসেবে ইসলাম এক ব্যাপক ও বিস্তৃত বিষয়ের নাম। তা মানবজীবনের সকল দিক বিভাগ ব্যক্তিগত, পারিবারিক সামজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক, তামুদ্দনিক এবং বৈশ্বিক সর্বত্র বিস্তৃত। পৃথিবীতে বসবাসের সূচনা হয়েছিল আবুল বাশার আদম (আ) হতে। তাঁর ওপর আল্লাহতায়ালার বিধান নাজিল থেকে ইসলামের যে বিকাশ শুরু হয়েছিল সাইয়েদেনা মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে শান্তিময় জীবন যাপনের বিধিবিধান হিসেবে আল্লাহর আখেরি কিতাব চূড়ান্ত কুরআন বলেছেন, “আজ আমি ইসলামী দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের জন্য নাজিল হওয়া অহির ধারা পরিসমাপ্তি করলাম আর একমাত্র ইসলামকে তোমাদের সকলের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করে দিলাম।”
এ কথা দিবালোকের মতো সত্য যে মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অতিক্রম করেছে পৃথিবীর গণ্ডি। নিঃসীম নীলিমায় প্রথম নাজিলে উড়িয়ে দিয়েছে বিজয় কেতন। সে অহঙ্কারী মানুষের পক্ষে সকল মানুষের সকল বিষয়ে অনাদিকালের জন্য নির্ভুল কল্যাণপ্রদ ও ভারসাম্যময় হয় এবং পূর্ণাঙ্গ একটি জীবন বিধান বা দ্বীন রচনা করা চিন্তারও অগম্য বিষয়। সকলের জন্য সকল সমস্যার বিধান রচনা করা দূরের কথা একটি মানুষের একটি দিনের চলার বিধান তৈরি করা আদৌও কি সম্ভব? এক ঘণ্টা পরে নিজ জীবনে কী ঘটবে অথবা পৃথিবীতে কোন বিপর্যয় আসছে যে বলতে পারে না তার পক্ষে বিধান দেয়া কী করে সম্ভব হতে পারে? প্রত্যেকটি সৃষ্টির কী প্রয়োজন? ক্ষুদ্র বৃহৎ কে কী অবস্থায় রয়েছে, কার আকুতি কী? এমনিতর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল বিষয়ে যিনি জ্ঞাত এমন সত্তা ছাড়া অহি প্রণয়ন কি সম্ভব হতে পারে? যার নিজেরও কিছু প্রয়োজন রয়েছে, নিজের সাথে রয়েছে রক্তের সম্পর্ক এমন কেউ কি নিরপেক্ষতা বজায় বাখতে পারে? তাই আমরা বলতে পারি ভবিষ্যতের জ্ঞান রয়েছে বর্তমানের মত, প্রত্যেকটি সৃষ্টির কী প্রয়োজন, কিসে তার ওপর ভালো বা মন্দ এ ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞানের অধিকারী-আর যিনি নিজে প্রয়োজনের ঊর্ধে যিনি সামাদ অর্থাৎ যার কোন কিছুর কোন প্রকার চাহিদা নেই, তিনি মহান স্রষ্টা।
আমরা জানি মানুষ আল্লাহতায়ালার নাজিলকৃত এ ইসলামী দ্বীনকে বাদ দিয়ে নিজেরা যখনই বিধান বানাতে চেষ্টা করেছে Super power; the mightest man of the whole world-এর নামে তখনই বিশ্বের এক একটি অঞ্চলে নেমে এসেছে বিপর্যয় আর মহা বিপর্যয়। সমস্ত মানব গড়া মতবাদ ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে আজ জাদুঘরে আশ্রয় নিচ্ছে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত মানব মস্তিষ্ক আর কোন নতুন দ্বীন জন্ম দিতেও পারছে না। কতগুলো বিকলাঙ্গ, অন্ধ, খন্জ, বধির, বোবা ও রুগ্ণ সন্তানের নামে প্রসব করে পৃথিবী আজ যেন প্রজনন ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে। পৃথিবীর জ্ঞানীগণ আবার ইসলামকে সমস্যার সমাধান মনে করতে শুরু করেছে। দার্শনিক বার্ট্রার্ন্ড রাসেল বলেন “Islam is a complete comprehensive and rational code of life”.
“একবিংশ শতাব্দীর মধ্যে ইসলাম বিশ্বে ছড়িয়ে যাবে। মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামের বিজয় আজ অনিবার্য।” এর প্রয়োজনীয়তা ও অনিবার্যতাকে কোন অত্যাচার, জুলুম, কামান-গোলা ও ক্ষেপণাস্ত্র এবং মারণাস্ত্র দিয়ে স্তব্ধ করা যাবে না। ইসলাম ছাড়া আর যত দ্বীন পৃথিবীতে আছে- সেগুলো মানবগড়া, ভারসাম্যহীন ও খণ্ডিত। সেগুলো হয় রাজনৈতিক নতুবা অর্থনৈতিক মতবাদ। সম্পূর্ণ জীবন নিয়ে এগুলো রচিত হয়নি। এগুলো পরিত্যাজ্য ও ব্যর্থ পরাশক্তির জনবল, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সমরাস্ত্র মোতায়েন করেও এর মধ্যে প্রাণ স্পন্দন সম্ভব হচ্ছে না।
হাদিসের শেষাংশে উদ্ধৃত হয়েছে- ঈমানের মজা তারাই পেয়েছে যারা মুহাম্মদ (সা)-কে নবী ও রাসূল হিসেবে পেয়ে পরিতৃপ্ত ও সন্তুষ্ট হয়েছেন। তার আনীত আদর্শকেই একমাত্র পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আল্লাহতায়ালা তাঁর মাধ্যমে নবুয়ত ও রিসালাত খতম করে দিয়েছে। সকল নবী রাসেেূলক একটি নিদিষ্ট জনবসতির জন্য পাঠানো হয়েছিল। বাইরে তাদের নবুওয়াতের দাওয়াত প্রদানের অনুমতি ছিল না। নবুওয়াতের ইতিহাসের একমাত্র ব্যতিক্রম মুহাম্মদ (সা)। তিনি কোন এলাকার বা আঞ্চলিক নবী নন তিনি আলমি তথা বিশ্বনবী। তার নবুওয়াতের কোন চিহ্নিত সীমানা নেই ও নেই কোন নির্দিষ্ট মেয়াদ। তিনি সমগ্র বিশ্বের জন্য আর অনাদিকালের জন্য রাসূল। কুরআন বলছে, “বল হে মানবমণ্ডলী আমি তোমাদের সকলের জন্যে রাসূল হয়ে এসেছি।” (সূরা আরাফ : ১৫৮)
কুরআন বলছে- “আখেরি রাসূল তোমাদের জন্যে যা এনেছেন বিনাশর্তে গ্রহণ কর, আর তা থেকে বিরত থেকে থাক যা তিনি নিষেধ করেছেন।” (সূরা হাশর : ৭)

উপসংহার

একজন মুমিনের ঈমানের অবস্থান কোন পর্যায়ে রয়েছে, এ হাদিস তা বুঝার এক মানদণ্ড। যে মুমিন সত্যিকারার্থে ঈমান এনেছে গোটা পৃথিবী সবকিছু ঈমানের মোকাবেলায় তার কাছে একটি পাখির ঝরা পালকের চেয়ে কমমূল্য বহন করে। আর ঈমান থেকে চ্যুত করার সমস্ত অত্যাচার ও জুলুম এবং নিপীড়নের তাবৎ হাতিয়ার তার নিকট এমন সাধারণ ও মামুলি বিষয় যেন লোহার কঠিন দণ্ডের ওপর মাছির ব্যর্থ আক্রমণ। এমন সুস্থ ও নিরোগ ঈমান শুধু কতগুলো কথা উচ্চারণ এর মাধ্যমে অর্জন সম্ভব নয় ৃনয় পৈতৃক সূত্রে পাওয়া অজ্ঞদের ঈমানের মিথ্যা আস্ফালনে।
কুরআন বলছে তারাই মুমিন- “সত্যিকারার্থে তারাই মুমিন যারা আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ঈমান এনেছে এবং তাতে কোন প্রকার সন্দেহ করেনি আর সংগ্রাম করেছে জান ও মাল দিয়ে।” (সূরা হুজরাত : ১৫)

এ সত্যিকার মুমিনদেরকে ঈমানের অমৃত স্বাদ পেতে হলে হাদিসে রাসূলের তিনটি শর্ত প্রণিধানযোগ্য-
এক : আল্লাহর রবুবিয়াতের ওপর অটল আস্থা ও তাতে সন্তুষ্ট হওয়া।
দুই : দ্বীন হিসেবে ইসলামকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেনে চলার দৃঢ় অঙ্গীকার ঘোষণা করা এবং সমস্ত পৃথিবীর চাকচিক্যপূর্ণ মিথ্যা ও মানবগড়া সকল মত ও পথ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। মুহাম্মদ (সা) এর রিসালতের সাক্ষ্য দান ও সমস্ত মহান ব্যক্তি এমনকি পূর্বের নবীদেরকে ও তাঁর মোকাবেলায় পেশ করার সুযোগ নেই বরং তা হবে ধৃষ্টতার নামান্তর।
তিন : জীবনের প্রতিটি কদমে তার সুন্নাতকে এভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে জন্মান্ধ যেমন করে চক্ষুষ্মানের লাঠি শক্তহাতে ধরে পথ চলে।
হে প্রভু! আপনাকে একমাত্র রব, মুহাম্মদ (সা) কে শেষ ও চূড়ান্ত রাসূল এবং ইসলামকে শুধু আল্লাহর মনোনীত দ্বীন হিসেবে আমাদের জন্যে যথেষ্ট বানাও।

রাসূল (সা)-এর সামাজিক ও মানবীয় চরিত্র

রাসূল (সা)-এর সামাজিক ও মানবীয় চরিত্র

অনুবাদ

হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুহাম্মদ (সা) তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রাহ) কে হেরা পাহাড়ে ঘটে যাওয়া অহি ও জিবরাইল-সংক্রান্ত সব কথা বলেন ও ভয়ার্ত চিত্তে বললেন, “আমি আমার জীবন সম্পর্কে আশঙ্কা করছি।” খাদিজা সান্ত¦না দিয়ে বলেন, “আল্লাহর শপথ! তা কখনও হতে পারে না, তিনি আপনাকে অপদস্থ করবেন না। ১. আপনি আত্মীয়াতার বন্ধন সংরক্ষণ করেন, ২. আপনি দুস্থ মানুষের বোঝা হালকা করেন, ৩. নিঃস্বদের আহার করান, ৪. অতিথিদের সেবা করেন, ৫. সত্যের পথে নির্যাতিতদের সাহায্য করেন।” (বুখারি)

হাদিসের শানেনজুল

আমরা জানি যে, নবীদেরকে আল্লাহতায়ালা জন্ম থেকে নবী করে পয়দা করেছেন। তবে নবুওয়ত ঘোষণা করার সময়টি আল্লাহ তাদেরকে অহির মাধ্যমে জানিয়ে দেন। এর পূর্বে তাদের নবুওয়তপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকে। খোদ নবীরও কিছুই জানা থাকে না। তবে হ্যাঁ নবুওয়তের আগে সকল নবীর জীবন থাকে পবিত্র ও মাহফুজ। আল্লাহ তায়ালা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। মুহাম্মদ (সা) ছিলেন জন্ম থেকে সকল বিষয়ে ব্যতিক্রম। তার বাল্যকাল, কৈশোর ও যৌবনকাল কেটেছে আরব জাহেলিয়াতের মধ্যে। শরাব, নারী ধর্ষণ ও খুন-খারাবি এবং অসংখ্য মূর্তির পরিবেশে জন্ম নিলেন, পালিত হলেন কিন্তু আশ্চর্য! পাপাচার ও বর্বতার সামান্যতম কণাও তার পূত-পবিত্র চরিত্রকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি। সমস্ত আরব জগতে শিশুকাল থেকে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘আল-আমিন’ ও আস্সাদেক হিসেবে। তিনি পরম সত্যবাদী ও আমানতদার। মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ। তিনি ছিলেন সর্বদা মানবতার মুক্তির চিন্তায় ধ্যানস্থ ও চিন্তিত ও নিঃসঙ্গপ্রিয়।
قال علِىُّ كانَ رسول لله (ص) مُتَوَاصِلَ الاَحْزانِ – دائمَ الفِكْر- لسْتُ لهُ راحةُُ (ترمذى)
হযরত আলী (রা) বলেন, নবীজি (সা) যেন সর্বদা নিমজ্জিত ছিলেন ব্যথার সমুদ্রে, ছিলেন চিন্তার মহাজগতে এবং সদা অস্থির অবস্থায়।” (তিরমিজি)
৪০ বছর বয়সে তার এ নিঃসঙ্গতা অস্থিরতা অসহ্য অবস্থায় পৌঁছে। তিনি অহি নাজিলের সময় থেকে তিন বছর পূর্ব হতে প্রতি রমজান মাস ব্যক্তিগত ইবাদাত ও ধ্যানে কাটাতেন মক্কার অদূরে জাবালে নুরের চূড়ায় এবং গুহায়। সেখান থেকে সোজা কাবা দেখা যেতো, তিনি থাকতেন কাবামুখী হয়ে। সে সময়ের আমল সম্পর্কে যতটুকু সিরাতকারেরা বলেছেন, নির্বাক হয়ে দেখতেন অপলক নয়নে-মহাকাশের নীলাকাশ, রাতের তারার মিতালি, পূর্ণিমায় উদ্ভাসিত চাঁদের হাসি। মৌনভাবে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের পাহাড়, মরুর বালুসমুদ্রে খাঁ খাঁ ঊর্মিমালা, দেখতেন মরু পাহাড়ের পাখ পাখালি ও বিচিত্র প্রাণিকুল।
اِنَّ فىْ خَلْقِ الثمواتِ و الارضِ واخْتلافِ اللَّيلِ والنَّهارِ لايَتِ لِّاولى الْبابِ
“আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন লুক্কায়িত এ মহাকাশ, বিশ্ব চরাচর, পাহাড় মরু ও জীববৈচিত্র্য ছিল তাঁর অধ্যায়ের এক এক মহাকাব্য, আর এর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা রহস্য যেন বিচিত্র অধ্যায়ের সূচিপত্র।”
প্রকৃতি যেন তাঁর পাঠশালা, বিশাল টহরাবৎংব তার ঠধৎংরঃু, তিনি তাঁর পাঠক ও গবেষক, তাঁর চিন্তার অন্যতম বিষয় মানবসমাজ ও বিপর্যস্ত মানবতা, তার চারদিকে নেশায় বুদ হয়ে থাকা নর-নারী, বিবস্ত্র নারী-পুরুষের কাবা প্রদক্ষিণ-তাওয়াফ করা, শত শত বিচিত্র রঙের ও আকার আকৃতির দেবদেবী যাদের সামনে সিজদায় লুটিয়ে থাকা সৃষ্টির সেরা মানুষ, অপ্রয়োজনে ও বিনা কারণে বছরের পর বছর রক্তের প্রতিশোধ ও যুদ্ধের হুঙ্কার, মানুষের জানমালের ওপর শক্তিশালীদের জুলুমের তা-ব, নারীদের ওপর চলছিল নেশাখোরদের বলাৎকার ও মেয়েশিশুদেরকে জীবন্ত কবরে মাটিচাপা দেয়ার ভয়াল দৃশ্য দেখা মুহাম্মদের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। অনেক চেষ্টা করেও এ জাহেলিয়াতের প্লাবন থামাতে না পেরে মুহাম্মদ (সা) চিন্তায় নিমগ্ন হলেন হেরাগুহায়, চেয়ে থাকতেন কাবার রহস্যময় কালো ঘরটির দিকে যা সভ্যতার প্রথম সূতিকাগার। তিনি যেন অপেক্ষায় আছেন কাবার মালিকের হেদায়াতের প্রত্যাশায়। কুরআন বলছে,
َ أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ – وَوَضَعْنَا عَنكَ وِزْرَكَ – الَّذِي أَنقَضَ ظَهْرَك
“আমি তোমার বক্ষকে কি নবুওয়তের জন্য প্রশস্ত করিনি? আমি তোমার থেকে সে চিন্তার বোঝা অপসারণই করেছি যা তোমার পাঁজর ভেঙে দিচ্ছিল।” (সূরা ইনশিরাহ : ১-৩)
এমনি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ৪০ বছর পূর্ণ হলে ২৭ রমজান রাতে আল্লাহর অহি নিয়ে আবির্ভূত হলেন জিবরাইল (আ), আকাশ পৃথিবীজুড়ে তার বিশাল অবয়ব, যে দৃশ্য মুহাম্মদকে ভয়ে ও বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিল। তিনি এত নিকটে এলেন, যা কুরআনের ভাষায়;
ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى – فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى – فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى
“অতঃপর জিবরাইল তার নিকটে অতি নিকটে এলো। তাদের মধ্যে দুই ধনুকবাতারও কম দূরত্ব এলো, তখন সে মুহাম্মদের ওপর অহি পৌঁছালো যা পৌঁছার কথা ছিল।” (সূরা নজম : ৮-১০)
নবীজির ওপর সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হলো। রাসূল (সা) অহি নাজিলের ভয়াল বিস্ময়ে কম্পিত দেহে অস্থির মনে হেরাগুহা ত্যাগ করে ঘরে গিয়ে খাদিজাকে বলেন,لَقَدْ خَشِيْتُ عَلئ نِفْسِي زَمِّلُونِي زَمِّلُونِي فَزَمِّلُوهُ
“আমাকে কম্বল জড়িয়ে দাও, কম্বল জড়িয়ে দাও, আমার জীবনের বিষয়ে আমি ভয় করছি।” (বুখারি)
তাকে কম্বল জড়িয়ে দিয়ে হযরত খাদিজা (রা) ১৫ বছরের জীবনে রাসূলের একান্ত সান্নিধ্যে থেকে তাকে কিরূপ দেখেছেন, সান্ত¦না দিতে গিয়ে সে প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন যা এরপর আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

 হাদিসের উৎস
সমগ্র দুনিয়ার হাদিসবেত্তাদের উসতাদ মুহাম্মদ বিন ইসমাইলের অমর গ্রন্থ, সহিহুল বুখারিতে এ হাদিস উক্ত হয়েছে। হাদিস মরফু, মুত্তাসিল সনদ সকল বর্ণনাকারী সেকাহ্ ১৬ বছর পরিশ্রম করে ছয় লাখ হাদিস হতে বাছাই করে ৭২৭৫টি হাদিস বুখারিতে গ্রহণ করেছেন (বুদরুদ্দিন আইনি)
সমস্ত দুনিয়ার মুহাদ্দিসদের ইজমা হলো, আল্লাহর কিতাবের পর আকাশের নিচে সর্বাধিক সহিহ্ গ্রন্থ ‘সহিহুল বুখারি।’ (ফাতেহুল বারি ও উমদাতুল কারি)
ইমাম নাসাঈ, বলেন, ‘হাদিসের সমস্ত কিতাবের মধ্যে বুখারি শরিফের চেয়ে উত্তম আর কোন কিতাব নেই।’ (মুকাদ্দমা মুসলিম)
তিনি হাদিস বাছাইয়ের কঠিন কাজটি করেছেন বায়তুল্লাহ শরিফে বসে আর বাছাইকৃত হাদিস দিয়ে অধ্যায় রচনা করেছেন মসজিদে নববীর রিয়াজুল জান্নাতে বসে। ইমাম বুখারির শিরোনাম রচনার মধ্যে রয়েছে তার অসাধারণ জ্ঞান প্রজ্ঞা, চাতুর্য ও গভির পা-িত্য, যা এখনও পর্যন্ত মুহাদ্দিসদের হতবাক করে দেয়। তাই বলা হয় ‘ফিকহুল বুখারি ফি তারা জিমিহি’ বুখারির অসাধারণ পা-িত্য তার কিতাবের শিরোনামের মধ্যে লুকিয়ে আছে।

 সাহিবুল হাদিস
প্রথম বর্ণনাকারী হিসেবে রয়েছেন উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা), যিনি হযরত আবু বকর (রা)-এর কন্যা। তিনি বেশি সুন্দরী ছিলেন বলে তাকে হোমায়রা বলতেন নবীজি (সা)। খাদিজার ইন্তেকালের পর নবীজি (সা) এর সাথে আয়েশার বিয়ে নিষ্পন্ন হয়। তখন আয়েশা মাত্র ছয় বছরের বয়স্কা, ৫০০ দিরহাম মহর নির্ধারিত হয়। হযরত আবু বকর বিয়ের খুতবা ও আকদ্ দেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে হযরত আবু বকর খুতবায় বলেন, আপনারা জানেন রাসূলুল্লাহ আমাদের নবী। তিনি আমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ প্রদর্শন করেছেন। এক সময় ছোট মেয়েদের নিয়ে আমরা অনেক কুসংস্কার গড়ে তুলেছি। মেয়েদের আমরা জীবিত পুঁতে ফেলেছি হাত-পা বেঁধে দেবীর পায়ে বলি দিয়েছি। আজ আমার প্রিয় কন্যাকে রাসূলের হাতে তুলে দিয়ে যাবতীয় কুসংস্কার মুছে ফেলতে চাই। রাসূলের সাথে আমার বন্ধুত্বকে অটুট রাখতে চাই। আমার প্রিয় কন্যা রাসূলের সাথে সাথে তাঁর আদর্শ ও বাণী প্রচার করবে।” সবাই মারহাবা বলে স্বাগত জানালো। হিযরতের সাত মাস পরে মদিনায় রাসূলের গৃহে আসেন। নবীজি ইন্তেকালের সময় আয়েশার বয়স হয়েছিল ১৮ বছর এবং ওফাতের পর ৪৮ বছর জীবিত ছিলেন। হাদিস বর্ণনাকারীদের মধ্যে আয়েশার স্থান উচ্চে। তিনি রাসূল থেকে ২২১০টি হাদিস বর্ণনা করেন। ৫৮ হিজরি ১৭ রমজান ৬৭ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর অসিয়ত অনুসারে জান্নাতুল বাকির কবরস্থানে রাতে তাঁকে দাফন করা হয়। তাফসির, হাদিস সাহিত্য ও নসবনামায় তার পা-িত্য অসাধারণ। তিনি ছিলেন অসাধারণ বাগ্মী। তাঁর চরিত্রের ওপর আল্লাহর আয়াত নাজিল হয়েছে। ইমাম যুহরী বলেন, ‘উম্মতের জ্ঞানসমুদ্র যত বড় আয়েশার জ্ঞানসাগর তার চেয়ে বড়।”

 হাদিসের ব্যাখ্যা
কথাগুলো মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে হযরত খাদিজার উক্তি। তিনি নবীজি (সা) এর সবচেয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী। সকল উম্মতের মধ্যে প্রথম ঈমান আনয়নকারী, জগতের শ্রেষ্ঠতম চারজন রমণীর অন্যতম। যিনি তার সকল ধনসম্পদের পাহাড় রাসূলের কদমে হাজির করে দেন। রাসূলের সব ছেলেমেয়ে তাঁর গর্ভে জন্মলাভ করেন। তিনি ২৫ বছর উম্মুল মোমেনিন হিসেবে নবীজির সান্নিধ্য লাভে ধন্যা হন। অহি লাভের পর রাসূল (সা) এর অস্থিরতায় তিনি সান্ত¦না দেন ও বলেন, كلاّ واللهِ ما يُخزِيك الله اَبَدََ (ও)َ
“আল্লাহর শপথ তিনি আপনাকে কখন অপমান ও অপদস্থ করবেন না”।
একজন স্ত্রীর মন্তব্য স্বামীর ব্যাপারে খুবই প্রণিধানযোগ্য। কারণ সুখে-দুঃখে, দিনে-রাতে সকালে-বিকেলে, রাগ-বিরাগ সর্বাবস্থায় নিবিড়ভাবে স্বামীকে দেখার সুযোগ তিনিই লাভ করেন। আর যদি স্ত্রীও হন অতীব বিচক্ষণ, সচেতন ও জ্ঞান ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন তবে তো কথাই নেই। যে মুহাম্মদকে গোটা আরব জনপদ পূর্বেই আল আমিন বলে ঘোষণা দিয়েছে। নবুওয়ত-পূর্ব জীবনে বর্বতার মধ্যে সভ্য, অশ্লীতার মধ্যে পরিচ্ছন্ন, পুঁতিগন্ধময়ের মধ্যে সৌরভ, অন্ধকারের মধ্যে আলো হিসেবে দেখছেন। তারপরও সবার প্রশংসার চেয়ে খাদিজার উক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নবীজি (সা) বলেন, “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর বিবেচনায় উত্তম।” তিনি আরও বলেছেন, আমার স্ত্রীদের বিবেচনায় আমি উত্তম। নবীজি (সা) এর সাথে খাদিজার দাম্পত্য জীবনের ১৫টি বছর তখন চলছিল। জীবনীকারেরা আরও দেখেছেন এ দীর্ঘ সময়ের কোনদিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন বিষয়ে উচ্চবাচ্য হয়নি, মান অভিমান পর্যন্ত হয়নি। সম্ভ্রান্ত, ধনবতী ও গুণবতী এই রমণী নবীজির জীবনে কিভাবে ছায়া হয়েছিলেন, খাদ্যসামগ্রী নিয়ে হেরার চূড়ায়ও উঠেছেন যা আজও যেন বিস্ময়! পৃথিবীর জীবনে আমরা এমন প্রায়ই দেখি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক, সেনাপতি, দার্শনিক ও জ্ঞানী কিন্তু পারিবারিক জীবনে সফল নহেন। সেখানে দ্বন্দ্ব, কলহ অবিশ্বাস, খোনাখুনি পর্যন্ত হচ্ছে আর বিচ্ছেদ তো চলছে অগণনভাবে। সেখানে মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে আল্লাহর শপথ করে তার জীবনের পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের ওপর আল্লাহর অনিবার্য সাহায্যের ব্যাপারে খাদিজার কথাগুলো কুরআনের বাণীরই প্রতিধ্বনি করছে। কিছুদিন অহি বন্ধ থাকায় নবীজি (সা) হৃদয়ে যে অস্থিরতা ও আশঙ্কা দেখা দিল, আল্লাহ সান্ত¦না দিয়ে বলেন,
وَالضُّحَى – وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَى- مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى- وَلَلآخِرَةُ خَيْرٌ لَكَ مِنْ الأُولَى .
“শপথ মধ্যাহ্নের আর নিশিথ রাতের। হে মুহাম্মদ (সা) তোমার প্রভু তোমাকে ত্যাগ করেননি, তোমার প্রতি বিরাগ ভাজনও হননি। নিশ্চয়ই বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যৎ তোমার অনেক উত্তম।” (সূরা দোহা : ১-১৪)
انك لتَصِلُ الرَّحِمَ (ওও)
“নিশ্চয়ই আপনি আত্মীয়দের সাথে মধুর সম্পর্ক ও সম্প্রীতি বজায় রাখেন।”
নবুওয়তের ঘোষণা দেয়ার পর যে বিষয় তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং কুরআন পরবর্তীতে যে আত্মীয়তার বিষয়ে আয়াত নাজিল করেছে রাসূলের জীবনে সে সকল চারিত্রিক মাধুর্য পূর্বেই বিকশিত হওয়ার ব্যবস্থা আল্লাহতায়ালা করেছেন। নবীজি (সা) রক্তের আত্মীয়দের ব্যাপারে সর্বদা যতœশীল ছিলেন। এক আবু লাহাব ছাড়া অন্য চাচারা ঈমান না আনলেও নবীজির সাথে অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক রাখতেন। আবু তালেব যদিও ঈমান আনেননি কিন্তু নবীজির জন্য সর্বস্ব দিয়ে সাহায্য করেছেন। যেখানে ইবরাহিম (আ)-এর পিতা আজর ইবরাহিমকে ঘরছাড়া করেছেন নমরুদের সাথে সহযোগিতায় আগুনের কু-লীতে নিক্ষেপ করার ব্যবস্থায় নিয়োজিত সেখানে রাসূলের চাচা আবু তালেব কাবাঘরের দায়িত্ব ত্যাগ করেছেন মুহাম্মদকে ত্যাগ করেননি। তিন বছর শে’বে আবু তালিবকে বন্দী অবস্থায় গাছের পাতা খেয়ে অনাহারে ছিলেন। বিনিদ্র রজনী মুহাম্মদকে পাহারাদারি করেছেন এর দৃষ্টান্ত দ্বিতীয়টি পাওয়া কঠিন। নিশিথ রাতে মিনার উপত্যকায় মদিনাবাসীর সাথে আকাবার বায়াত অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সে সময় খঞ্জর হাতে রাসূলের পাহারাদারিতে দ-ায়মান। সে ব্যক্তিটি রাসূলের চাচা হামজার ছোটভাই আব্বাস তখনও ছিলেন মুশরিকদের মধ্যে। আবার চাচা আবু তালিবের আর্থিক কষ্ট লাঘব করতে চাচাতো ভাই আলীর দায়িত্বে ছোট থেকেই রাসূল গ্রহণ করেছেন। নবুওয়তের দায়িত্ব পালনের পরও আত্মীয়তার বিষয়ে অনেক হাদিস উল্লেখ করেছেন আর নির্দেশ অবতীর্ণ হয়েছে কুরআনুল কারিমে,
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَتَسَاءَلُونَ بِهِ وَالأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيباً.
“তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যার নামে তোমরা অধিকার দাবি কর আর সতর্ক থাক আত্মীয়তার অধিকার ও সম্পর্কের বিষয়ে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা নিসা : ০১)
رَّحِمْ قاطِعُ الجنَّةَ يدْخُلُ لا قال رسول لله (ص)
“সাবধান রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়তা ছিন্নকারীরা জান্নাতে যাবে না।” (বুখারি)
اللَّهَ قطعهُ قَطعنىْ وَمَنْ اللَّهَ وصلهُ وصلنِىْ مَنْ فقولُ بالْعرسِ مُعلَّقةُ الرَّحِمُ عَنْ عاَئشة قالتْ فَقال رسول لله
“আত্মীয়তার সম্পর্ক তথা ‘রেহেমকে’ আল্লাহ আরশের সাথে লটকিয়ে রেখেছেন যে তা ঠিক রাখবে সে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবে, যে বিচ্ছিন্ন করবে সে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন বিনষ্ট করবে।” (বুখারি)
আজকের সমাজে ভাইয়ে ভাইয়ে, পিতা-পুত্রে, চাচা-জেঠাদের সাথে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সুসম্পর্ক নেই বরং নিকট-আত্মীয়রা যেন অন্যদের চেয়েও বেশি শত্রু। সামান্য কারণে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই রয়েছে। তা চলছে বছরের পর বছর ধরে। আজ রক্তের সে অবহেলিত দাবি পূরণ করা সুস্থ সমাজের জন্য জরুরি।
و تَحْمِلُ الْكَلَّ (ওওও)
“নিশ্চয় আপনি দুর্বলদের বোঝা বহন করেন।”
হযরত খাদিজা (রা) বলেন, ‘আপনাকে দেখেছি সারাজীবন দুর্বল ও বঞ্চিতদের বোঝা বহন করতে। সমাজের বেশির ভাগ মানুষ দুর্বল ও অবহেলিতদের মধ্যে এরা ন্যূনতম মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারে না। এরাই সমাজের মূল ¯্রােত। এরা সবসময় স্বল্পসংখ্যক সুবিধাভোগীর হাতে নিপীড়িত। মুহাম্মদ (সা) এদের অন্তর্ভুক্ত। সোনার চামচ মুখে নিয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি। তিনি তো স্বল্প অর্থের বিনিময়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত মক্কাবাসীর বকরি চরিয়েছেন। ইমাম বুখারী এমন একটি হাদিসও গ্রহণ করেছেন। আল্লাহতায়ালা এমন কোন নবী পাঠাননি যিনি রাখাল ছিলেন না। আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি বেশির ভাগ নবী শ্রমজিবী। রাসূল (সা) সমগ্র জীবন ইয়াতিম ও বেওয়ারিশ ও মিসকিনদের জন্য জীবনপাত করেছেন। তিনি এতটুকু বলেছেন আমার উম্মতের বেশির ভাগ মানুষ গোলাম, শ্রমজীবী ও ইয়াতিম হবেন। তাদের বোঝা হালকা করার জন্য নিয়োজিতরা জান্নাতি।
قال قال رسول اللهِ (ص) لا يدخل الجنَّةِ سيعئ الملكةِ قالو يا رسول اللهِ اليس اخبَرْتنا هذهِ الاُمَّة اكْثرُ الامَمِ ممْلوْكينَ و يتامى؟ قال نعمْ- فاكرمُوْا هُمْ لَكَرمَةِ اَوْلاَدُكُم وَ اطْعِمُهُمْ مِمَّا تأكُلون
নবীজি (সা) বলেন, জালেম মালিকেরা জাহান্নামি, লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদেরকে বলেননি, এ উম্মতের বেশির ভাগ মানুষ হবে গোলাম ও ইয়াতিম? তিনি বলেন, হ্যাঁ, তোমরা সন্তানের মতো তাদেরকে ¯েœহ করবে আর তোমরা যা খাবে তাদেরকে তাই খেতে দেবে।” (ইবনে মাজাহ)
আজকের সমাজে কী দেখি? মানুষ কিভাবে জালেমদের অত্যাচারে নির্বাক ও নিথর, মজলুমেরা আদালতের কাঠগড়ায় ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়ে অশ্রুবিসর্জন করছেন।
(রা) و تَكسِبُ المعْدوم
হযরত খাদিজা বলেন, ‘আপনি তো নিঃস্বদের আহারের ব্যবস্থা করেন, আপনি নিরন্ন মানুষের মুখে খাবার তুলে দেন, আপনি বিবস্ত্রদের কাপড় দেন, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আপনার কল্যাণ করবেন।
এ দরিদ্র, নিঃস্ব বুভুক্ষুরা আল্লাহর পরিবারের সদস্য। একটি হাদিসে এমন রয়েছে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলবেন কিয়ামতে “হে বনি আদম! আমি ক্ষুধার্ত হয়ে তোমার নিকট গিয়েছিলাম তোমরা আমাকে খাবার দাওনি, লোকেরা বলবে তুমিতো আহার কর না, কিভাবে তোমায় করাবে? আল্লাহ বলবেন সে ক্ষুধার্তকে খাবার দান করা হলে আমাকে খাদ্য দেয়া হতো।” সোবহানাল্লাহ্। (মুসলিম)
عنْ بْنِ عبَّاسِ قال سمِعْتُ رسولُ اللهِ يقول ليسَ المومنُ الَّذى يَشْبَعُ و جاَرُهُ جاععُ اِلى جنْبِه
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আমি রাসূলের জবানে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “তারা মুমিন নয় যারা প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রেখে আহার করে।” (মিশকাত)
মুহাম্মদ (সা) প্রতিবেশীদের খবর নিতে, আসহাবে সুফফার লোকদের আহারের ব্যবস্থা না করে খাবার মুখে দেননি।
বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ দু’বেলা আহার করতে পারছে না, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে লাখ লাখ মানুষ। আমাদেরকে তাদের মুখে অন্ন ও পরিধানের বস্ত্র ও আর্তের চিকিৎসার জন্য লড়াই করতে হবে। রাসূল (সা) জীবনে কী ছিল? আমরা কোথায়, কোন ইবাদাতের মধ্যে জান্নাত খুঁজছি। আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে মানবতার সেবায়।
و تقرى الضيفُ (া)
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি অতিথির সেবা করেন।’
কাবা শরীফ মক্কায় অবস্থিত বিধায় হাজার হাজার বছর থেকে কাবাকেন্দ্রিক বিভিন্ন এলাকা ও জনপদ থেকে তীর্থযাত্রীরা ভিড় জমাতো। কোরাইশ পৌত্তলিকেরা বিদেশীদের জীবন সম্পদ লুণ্ঠনের উৎসব করত বিশেষ করে হজ মৌসুমে। যদিও জাতিগতভাবে আরবিরা অতিথিপরায়ণ কিন্তু অসৎদের আর মূল্যবোধের বালাই থাকে না।
মুহাম্মদ (সা) বাল্যকাল হতে অসহায় বিদেশী ও অতিথিদের সহায় সম্পদ লুণ্ঠনের দৃশ্য দেখে আসছিলেন। পরে হিলফুল ফুজুল সংগঠন সৃষ্টির উদ্দেশ্যও ছিল সমাজে শান্তিপ্রতিষ্ঠা, বিদেশীদের নিরাপত্তা প্রদান। চার বছর ধরে ফিজ্জার যুদ্ধ হয়েছিল আরব গোত্রদের মধ্যে। রাসূল (সা) এর বয়স তখন চৌদ্দ। পরের বছর রাসূল তার প্রিয় চাচা যুবায়ের বিন আবদুল মোত্তালিব আবদুল্লাহ বিন জুমআনের ঘরে বনি হাশিম ও বনি যুইবার বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে এক সভা বসে। গঠিত হয় পাঁচ দফার ওপর প্রতিজ্ঞা।
১. দেশ থেকে অশান্তি দূর করব ২. বিদেশী মেহমানদের জানমাল রক্ষা করব ৩. গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করব ৪. দুর্বলদেরকে জালেমদের হাত থেকে প্রতিরক্ষা করব, ৫. আমরা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনে চেষ্টা করব। এ পবিত্র প্রতিজ্ঞাবাণীর নাম ছিল ‘হিলফুল ফুজুল’। নবুওয়তের পর একদিন রাসূল (সা) বলেন, ‘আবদুল্লাহ বিন জুমআনের ঘরে যে প্রতিজ্ঞায় অংশ নিয়েছিলাম, আমাকে রক্তিম বর্ণের উট দান করলেও আমি সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করব না। আজও যদি কেউ আমাকে অত্যাচারিত হয়ে আহ্বান করে বলে হে ফজুল প্রতিজ্ঞার সদস্যগণ আমাকে সাহায্য কর তবে আমি সে ডাকে সাড়া দেবো। ইসলাম ন্যায়প্রতিষ্ঠা ও মজলুমদের সাহায্য করার জন্য এসেছে।
قال قال رسول اللهِ (ص) مَنْ كانَ يومِنُ باِاللهِ و اليَومِ الاخِرِ فليُكْرِمْ ضيْفَةُُ ( بُخارى)
“কেউ যদি আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈামন আনে সে যেন অতিথির সেবা করে।” (বুখারি)
আজকের বিশ্বে বিদেশী ও অতিথিদের কোনো সম্ভ্রম সংরক্ষিত আছে কি? সময় যেন দাবি করছে যুবকদের আবার ‘হিলফুল ফুজুলের’ প্রতিজ্ঞা করে অত্যাচার ও নিপীড়নমুক্ত সমাজ গঠনের শপথ করা। দুর্ভাগ্য আমাদের মুক্ত চেতনার নামে যুবক ও তরুণদেরকে কিভাবে কায়েমি স্বার্থবাদীরা নিজেদের লুণ্ঠনকে বহাল রাখা ও শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার জন্য নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করছে।
(ার) و تُعينُ على نَوَائبِ الحَقّ “সত্যের পথে নির্যাতিতদের আপনি সাহায্য করেন।”
খাদিজার এ উক্তিটিও তাৎপর্যপূর্ণ। হকের পথে, ন্যায়ের পথে যারা যে যুগেই চলতে চেয়েছে নিষ্ঠুর সমাজ তাদের চলার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে, তাদেরকে জুলুম-নিপীড়ন নির্যাতনের বিষাক্ত কাঁটা মাড়িয়ে চলতে হয়েছে। কারাগারের নির্যাতন, সেল ও ফাঁসির রজ্জু তাদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে যেন। এটি একটি কঠিন বিষয় যা মেনে নিতে মন চায় না। সত্যপথের পথিকদের জন্য জীবনকে কঠিন হতে কঠিনতর করা হয়েছে পরীক্ষার পর পরীক্ষার নির্মমতা লাজেম করা হয়েছে।
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنْ الأَمْوَالِ وَالأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرْ الصَّابِرِينَ – الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
“আমি তোমাদেরকে (মুমিনদের) ভয়ভীতি, ক্ষুধা, ধনসম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব, তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুভসংবাদ দাও, যারা যেকোনো বিপদ-মুসিবতে বলে আমরা আল্লাহর কাছ হতে এসেছি এবং তারই নিকট ফিরে যাব।” (সূরা বাকারা : ১৫৫)
আর আল্লাহ তায়ালা জালেমদের শুধু অবকাশ দেন ও ঢিল দিতে থাকেন। তবে তা অনাদিকালের জন্য নহে, একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হলে রশি টান দেন।
اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
“আল্লাহ তাদের সাথে উপহাস করে পাপাচারে ঢিল দেন আর তারা অন্ধ হয়ে ছুটে চলে।” (সূরা বাকারা : ১৫)
সত্যের জন্য ন্যায়ের পথে চলতে গিয়ে যারা নির্যাতিত হয়েছেন নবুওয়তের আগে ও পরে মুহাম্মদ (সা) ছিলেন তাদের আশ্রয়ে। তিনি তাদের সান্ত¦Íনা, আর নবীজি (সা) ছিলেন সকলের প্রিয়জন। হেদায়াতের দাওয়াত তাকে করেছে সবচেয়ে মজলুম। নবুওয়তের প্রথম দিন খাদিজা (রা) মুহাম্মদ (সা)-কে ওরাকার কাছে নিয়ে গেলে তিনি বলেন, ‘তোমার নিকট জিবরাইল এসেছে যিনি নবীদের নিকট আসেন। মূসা (আ)-এর নিকটও এসেছিলেন। আহা! আমি যদি বেঁচে থাকি তোমাকে যেদিন মক্কা হতে বের করে দেয়া হবে সেদিন আমি তোমার সাহায্যে পাশে দাঁড়াবো। নবীজি জিজ্ঞাসা করেন আমাকে কেন বের করবে? ওরাকা বলেন,
رجُل قطُّ بمثْلِ ما جِئتُ الَّا عُودِىَ بهياتِ لمْ যারা তোমার পূর্বে অহি বহন করেছিলেন সত্যের দাওয়াত দিয়েছিলেন জাতি তাদের সকলের সাথে শত্রুতা করেছে। (বুখারি)

 হাদিসের শিক্ষা
মুহাম্মদ (সা)-এর সামাজিক ও মানবীয় চরিত্র যা খাদিজা (রা) বর্ণনা করেছেন সেগুলোই শিক্ষা যা উম্মতের জন্য গ্রহণীয়।
১. সে উত্তম ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর বিবেচনায় উত্তম, খাদিজা কসম করে বলেন মুহাম্মদের চেয়ে উত্তম মানব ত্রিভুবনে নেই।
২. সমাজের অবহেলিত, নিপীড়িত মজলুমদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে।
৩. দরিদ্র্য সীমার নিচে রয়েছে কোটি কোটি বনি আদম, এরা মানবতার মূল ¯্রােতধারা, চেষ্টা করে যেতে হবে নিরন্নদের মুখে অন্ন তুলে দিতেÑ তা-ই সর্বোচ্চ বন্দেগি ও ইবাদত বুঝতে হবে।
৪. অতিথি দেশী, বিদেশী, পরিচিত-অপরিচিত সকলের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়াতে হবে-এটা মানবতার শিক্ষা।
৫. সমগ্র পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে দ্বীনের দায়ীরা মজলুম। তাদের রক্ত বয়ে চলছে পিচঢালা কালো পথে, কারার অন্ধ প্রকোষ্ঠে তাদের ওপর চলছে রিমান্ডের নামে লোমহর্ষক জুলুমের ইতিকথা, ফাঁসির রজ্জু তাদের গলদেশে ‘যারা বলছেন আল্লাহ ছাড়া কারো আইন মানব না।’ তাদের সাহায্য করার জন্য যা আছে সব নিয়ে নামতে হবে।
 উপসংহার
কোন আদর্শকে পৃথিবীর মাটিতে প্রতিষ্ঠিত করা একটি সহজ বিষয় নয়। এ অসাধ্যকে সাধন করতে হলে দু’টি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো গতিশীল নেতৃত্ব আর দ্বিতীয়টি হলো কর্মীদের গুণাবলি। যেকোনো আদর্শের নেতাকর্মীদের নৈতিক কিছু অপরিহার্য গুণাবলির সাথে প্রয়োজন সামাজিক চরিত্র। এ ঝড়পরধষ ঈযধৎধপঃধৎ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে তা ছাড়া ঐ আদর্শকে মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য করা কঠিন। আদর্শ কতটুকু মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ ও সঠিক এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আদর্শকে প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত কর্মীদের গুণাবলি ও যোগ্যতা। বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণের সূচনা আজ মানবতার জন্য একটি শুভসংবাদ হলেও কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠিত ফেরাউনি শক্তি কখনও তাকে মেনে নেবে না। ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে চলমান ভূ-রাজনৈতিক আস্থা ও ইসলামের শত্রুদের কর্মকৌশল ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে বিপ্লব যে শুধু বিজয় বন্দরে নোঙর করতে পারবে না তা নয়, লাখ লাখ কর্মীর জানমাল বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। ইসলামকে বিজয়ী করার সিদ্ধান্ত যারা নিয়েছে তাদের মধ্যে নৈতিক যে গুণাবলি প্রয়োজন তা হলো,
১. ইসলামের সঠিক জ্ঞান যার উৎস আল্লাহর কিতাব ও হাদিসে রাসূল।
২. চরিত্র হবে নিষ্কলুষ ফরজ, ওয়াজিব পালন ও কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
৩. ইসলামকে জীবন উদ্দেশ্য বানাতে হবে-জীবন ও মরণ ইসলামের জন্য নিবেদন করা।
৪. সর্বোচ্চ কোরাবানির জন্য প্রস্তুত থাকা- শাহাদাতে তামান্না সৃষ্টি করা।
৫. আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক-তাহাজ্জদ গুজার হওয়া।
আমি উল্লিখিত গুণাবলিকে নৈতিক বিবেচনা করে বলতে চাইÑ এর মাধ্যমে আল্লাহর বান্দা জান্নাতে হয়তো যাবে কিন্তু বিপ্লব বিজয় করার জন্য তা যথেষ্ট হবে না। আরও কিছু সামাজিক চরিত্র প্রয়োজন হবে- যা করার জন্য মুহাম্মদী আখলাক বর্ণনা করতে গিয়ে খাদিজা বর্ণনা করেছেন। ১. মানবতার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ২. দুস্থ ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকা। ৩. মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা। ৪. আত্মীয় ও প্রতিবেশীর সেবায় সর্বদা ব্যস্ত থাকা ৫. সত্যের পথে নির্যাতিতদের জন্য সর্বস্ব কোরবানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বিপ্লবের কর্মীদেরকে নৈতিক ও সামাজিক গুণাবলির সমন্বয় সাধন করা আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি। এরপর আমি শত্রুদের কৌশল সম্পর্কে সাবধান করতে চাই :
১. মুসলিম যুবকদের চরিত্র ধ্বংস করতে তারা বদ্ধপরিকর। এ ব্যাপারে তারা তিনটি হাতিয়ার প্রয়োগ করছেÑ এক, নারীদেরকে ব্যবহার করা নৈতিকভাবে দেউলিয়া করতে হলে এর আক্রমণ অব্যর্থ। এ জন্য আকাশ সংস্কৃতির অবাধ প্রবাহ যা প্রযুক্তির বদৌলতে প্রত্যেকের মোবাইলে ঢুকে পড়েছে। এই ভয়াল ছোবল থেকে কিছুই রেহাই পাবে না। দুই, নেশাকে সহজলভ্য করে, নেশায় আসক্ত করা, আমাদের ছাত্রদের প্রায় ৩০ লাখের ওপর আসক্তদের সংখ্যা পৌঁছে গেছে। সত্যিকথা বলতে কী এর চেয়ে ভয়াবহ আর কিছু নেই। তিন, আমাদের যুবকদের হৃদয়ে তারা অর্থবিত্ত, আরাম-আয়েশ, গাড়ি, বাড়ির স্বপ্ন এঁকে দিয়েছে, মুছে দিয়েছে শাহাদাতের তামান্না। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আল্লাহর শপথ, আমার হৃদয় হাহাকার করছে। আমি জিহাদ করি শহীদ হই, আবার জীবিত হই আবার শহীদ হই। (বুখারি)
২. ‘সন্ত্রাস’-কে তারা মুসলিম দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে, আমাদের যুবকদের হাতে এর গোলাবারুদ তুলে দেবে আর কেড়ে নেবে-আল কুরআন।
৩. মিডিয়ার মাধ্যমে অপপ্রচার। এর ক্ষমতা পরমাণুর চেয়েও বেশি। শত্রুরা দিনকে রাত, সাদাকে কালো, মুসলমানদেরকে তাদের হক জিহাদকে জঙ্গিবাদ বলে প্রচার করছে ও আর্থিকভাবে সফল হয়েছে। আফসোস, মুসলমান রাষ্ট্রনায়কদ ও তথ্যমন্ত্রীদের বক্তব্য ও মিথ্যাচার শুনলে মনে হয় শত্রু আজ দূরে নয়, তাদের অমবহঃ-রা শত্রুদের চেয়েও সার্থক ও ভয়ানক শত্রু এ মিল্লাতের জন্য। এত ষড়যন্ত্র ও প্রতিরোধের পরও আশ্চর্য যে ১. ইসলামের অগ্রযাত্রা কোনো বাধা ও প্রতিবন্ধকতা মানছে না। খোদ ইউরোপ, আমেরিকায়ও ইসলাম আজ এক অদম্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। ২. এত রক্ত, শাহাদাত ও ফাঁসির আতঙ্ক খুন গুমকে পা দিয়ে মাড়িয়ে যুবকেরা সংগঠিত হচ্ছে বিপ্লব বিজয়ের উন্মাদনায়। এদের রক্তে আগুন ধরেছে, কার সাধ্য এ অনল নেভাবে। তাদের প্রতি আমার সবিনয়ে পরামর্শ :
এক, তোমাদেরকে কৌশলী হতে হবে। রাসূল (সা) বলেছেন, ‘যুদ্ধ হচ্ছে শত্রুকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর নাম।” চ্যালেঞ্জ নয়। তাদেরকে ঘুমন্ত রেখে অতি সন্তর্পণে লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।
দুই, সার্বক্ষণিক দায়ী হওয়া। এ দাওয়াতই ইসলামকে পৌঁছে দেবে সর্বত্র। তা শত্রুর হৃদয়েও অনুভূতি জাগাবে।
তিন, দাঁড়ানো, বসা ও চলন্ত অবস্থায় কুরআন পড়া-এর মধ্যে পৃথিবীকে বশীভূত করার জাদু আছে।
চার, আরাম নয়, বিলাস নয়, কঠোর সংগ্রামী জীবনকে বরণ করে নিতে হবে।
পাঁচ, দল নয়, জাতি নয়, মানবতাবাদী হও। মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ইসলামের মূলমন্ত্র হতে হবে।
প্রভু! আমাদের যুবকদের যোগ্যতা দিয়ে দয়া কর। আমিন।

সাত প্রকার লোককে আল্লাহ তায়ালা তার আরশের ছায়া দান করবেন

সাত প্রকার লোককে আল্লাহ তায়ালা তার আরশের ছায়া দান করবেন

অর্থ ঃ হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা:) বলেছেন: সাত প্রকার লোককে আল¬াহ তায়ালা (কিয়ামতের দিন) তার আরশের ছায়ায় স্থান দান করবেন। সেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর অন্য কোন ছায়া থাকবে না।
১. ন্যায় পরায়ন নেতা।
২. ঐ যুবক যে তার যৌবন কাল আল¬াহর ইবাদতে কাটিয়েছেন।
৩. এমন (মুসলি¬) ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে লটকানো থাকে, একবার মসজিদ থেকে বের হলে পুনরায় প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত ব্যাকুল থাকে।
৪. এমন দু’ব্যক্তি যারা কেবল আল¬াহর মহব্বতে পরস্পর মিলিত হয় এবং পৃথ হয়।
৫. যে ব্যক্তি নির্জনে আল¬াহর ভয়ে অশ্র“ ফেলে।
৬. যে ব্যক্তিকে কোন সম্ভ্রান্ত বংশের সুন্দরী রমনী ব্যভিচাওে লিপ্ত হওয়ার আহবান জানায় আর ঐ ব্যক্তি শুধু আল¬াহর ভয়েই বিরত থাকে।
৭. যে ব্যক্তি এত গোপনে দান করে যে তার ডান হাত কি দান করলো বাম হাতও জানলো না। (বুখারী-মুসলিম)

হাদীসের পরিচয় ঃ
রাবী’র পরিচয় ঃ
নাম: তার নাম সম্পর্কে ৩৫টি অভিমত পাওয়া যায়। বিশুদ্ধতম অভিমত হলো ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নাম ছিল।
১. আবদুস শাসছ
২. আবদু আমর
৩. আবদুল ওযযা
ইসলাম গ্রহণ করার পর –
৪. আব্দুল¬াহ ইবনে সাখর।
৫. আবদুর রহমান ইবনে সাখর
৬. ওমায়েক ইবনে আমের

উপনাম: আবু হুরায়রা।
পিতার নাম: সাখর
পিতার নাম: উম্মিয়া বিনতে সাফীহ। অথবা মাইমুনা।
আবু হুরায়রা নামে প্রসিদ্ধির কারণ ঃ
আবু হুরায়রা শব্দের অর্থ বিড়াল ছানার পিতা। (আবু=পিতা; হুরায়রা=বিড়াল ছানা) একদা তিনি তার জামার আস্তিনের নিচে একটা বিড়াল ছানা নিয়ে রাসূল (সা:) এর দরবারে হাজির হন। হঠাৎ বিড়ালটি সকলের সামনে বেরিয়ে পড়ে। তখন রাসূল (সা:) রসিকতা করে বলে উঠলেন- “হে বিড়ালের পিতা” তখন থেকে তিনি নিজের জন্য এ নামটি পছন্দ করে নেন এবং প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
ইসলাম গ্রহণ ঃ তিন ৭ম হিজরী মোতবেক ৬২৯ খৃস্টাব্দে খায়বার যুদ্ধের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রখ্যাত সাহাবী তুফায়িল বিন আমর আদ-দাওসীর হাতে ইসলামে দীক্ষিত হন।
হাদীস বর্ণনা ঃ সর্বপেক্ষা অধিক হাদীস বর্ণনাকারী। বর্ণিত হাদীস ৫৩৭৪ টি। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম শরীফে ৪১৮টি।
মৃত্যু ঃ ৭৮ বছর বয়সে মদীনার অদূরে কাসবা নামক স্থানে।
গ্রন্থ পরিচিতি ঃ
গ্রন্থ প্রণেতা ইমাম মুসলিম যার পূর্ণ নাম আবুল হোসাইন মুসলিম বিন হাজ্জাজ আল কুশাইরী আন-নিশাপুরী। খুরাসানের প্রসিদ্ধ শহর নিশাপুওে ২০৪ হিজরী ২৪ শে রজব জন্মগ্রহণ করেন। ১৫ বছর সহ হাদীস সংখ্যা ১২,০০০। ছাড়া ৪,০০০ মাত্র। এ মনীষী ২১৬ হিজরী সনে ৫৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

ব্যাখ্যা ঃ এখানে কিয়ামতের এক ভীষণ চিত্রের কথা তুলে মানুষের মনে প্রথমে ভীতি জাগানো হয়েছে। এরপর সেই ভীতি বা শাস্তি থেকে যে শ্রেণীর লোক রক্ষা পাবে তার বর্ণনা দিয়ে মূলত মানুষকে সেইসব গুনে গুনান্বিত হওয়ার জন্য আহবান জানানো হয়েছে।

১. ন্যায় পরায়ন নেতা ঃ মূলত এখানে নেতা বলতে সর্বস্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে বোঝানে হয়েছে। তা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বা কোন দলের নেতা যাই হোক না কেন। নেতৃত্বের ব্যাপারে ন্যায় ও ইনসাফ।
হাদীস:- “সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারী-মুসলিম)
ইনসাফ ভিত্তিক নেতৃত্ব না হলে তা অধিনস্তদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। নেতৃত্বের প্রতি অনীহা সৃষ্টির ফলে সমাজে ও রাষ্ট্রে বিশৃংখলা দেখা দেয়।
রাসূল (সা:) বলেন “যে ব্যক্তি মুসলমানদের যাবতীয় ব্যাপারে দায়িত্বশীল হওয়ার পর তাদের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করবে আল¬াহ তার জন্য বেহেশত হারাম করে দেবেন।” (বুখারী-মুসলিম)
আল কোরআনের বিচারে ন্যায় পরায়ন নেতার বা রাষ্ট্র প্রধানের ৪ দফা কাজ-
১. নামাজ কায়েম করা
২. যাকাত আদায় করা
৩. সৎ কাজের আদেশ করা
৪. অসৎ কাজে নিষেধ/বাধা দেয়া

আয়াত ঃ
অর্থ ঃ “তারা এমন লোক যাদেরকে আমি যমিনে ক্ষমতা দান করলে নামায কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে বাধা দেবে। আর সব বিষয়ের চুড়ান্ত পরিণতি আল¬াহর হাতে।” (সুরা হজ্জ-৪১)
অর্থ ঃ “আমি তাদেরকে মানুষের নেতা বানিয়েছিলাম তারা আমার বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করে পথ প্রদর্শন করে। আমি ওহীর মাধ্যমে তাদেরকে ভালো কাজ করার, নামাজ কায়েম করার এবং যাকাত আদায় করা আদেশ করেছি, তারা খাটিভাবে আমার ইবাদত করত।” (সুরা আম্বিয়া-৭৩)

২. যৌবন কাল ঃ ঐ যুবক যে তার যৌবন কাল আল¬াহর ইবাদতে কাটিয়েছে।
হাদীস ঃ
ক. পাচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা (জীবনকাল কোন পথে ব্যয়/ যৌবন কাল কোন পথে ব্যয়)
খ. পাচটি বিষয়ের পূর্বে পাচটি বিষয় গুরুত্ব দেয়া।
পূর্বের হাদীস দুটির ব্যাখ্যায় এ বিষয় আলোচিত হয়েছে।

৩. এমন মুসল¬ী যার অন্তরকরণ মসজিদের সাথে ঃ অন্তকরণ মসজিদের সাথে ঝুলানো থাকে এর অর্থ আল¬াহর সাথে সান্নিধ্য লাভের ব্যাপারে তার ব্যাকুলতা। দৈনিক পাচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে পড়ার জন্য ব্যাকুলতা।
হাদীস ঃ নামায মূমিনদের জন্য মেরাজ স্বরুপ। মসজিদে জামায়াতে নামায পড়ার গুরুত্ব। এর ফলাফল লোক দেখানো হয় না।

৪. পরস্পর মিলিত হওয়া ও পৃথক হওয়া ঃ মুসলমানদের প্রত্যেকটি কাজ আল¬াহর উদ্দেশ্যে এবং ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্যই হওয়া উচিত। কোন কিছুকে ভালবাসলে তা আল¬াহর জন্য এবং পরিত্যাগ করলে তাও আল¬াহর জন্য হতে হবে।
কোরআন ঃ “বলুন আমার নামায, আমার কোরবানী, আমার জীবন, আমার মরন সবই একমাত্র আল¬াহর জন্য। (আন আম-১৩২)
হাদীস ঃ আবু উমামা (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা:) বলেছেন যে ব্যক্তির কাউকে ভালবাসা, ঘৃণা করা, দান করা ও দান না করা নিছক আল¬াহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই হয়ে থাকে, সে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার। (বুখারী)
ইসলামের জন্যই যুদ্ধের ময়দানে একজন সাহাবীর হাতে তারই কাফের পিতার মৃত্যুর ঘটনা।

৫. আল¬াহর ভয়ে চোখের অশ্র“ ফেলা ঃ নির্জনে আল¬াহর ভয়ে দু’কারণে অশ্র“ বিসর্জনে-
ক. আল¬াহর আজমত-জালালাত বা শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বের জন্য।
খ. নিজের অপরাধ স্মরণ করে মুক্তিলাভের জন্য।
রাসূল (সা:) বলেছেন- “যে ব্যক্তি আল¬াহর ভয়ে অশ্র“পাত করেছে তার জাহান্নামে প্রবেশ করা তেমনি অসম্ভব যেমনি অসম্ভব দোহন করা দুধকে পুনরায় ওলানে প্রবেশ করোনো। যে ব্যক্তি আল¬াহর সন্তুষ্টির জন্য তার পথে জিহাদ করেছে সে ব্যক্তি আর জাহান্নামের ধোয়া একত্র হবে না।” (তিরমিযী)
রাসূল (সা:) বলেন- “দু’ধরনের চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারবে না।
২. ঐ চোখ যা আল¬াহর ভয়ে অশ্র“ বিসর্জন দেয়।
৩. ঐ চোখ যা আল¬াহর পথে পাহারাদারীতে রাত জাগে।” (বুখারী)

৬. চরিত্রের হেফাজত ঃ যৌবনকালে নারী-পুরুষ পরস্পর পরস্পরের সান্নিধ্য চায়। সৃষ্টিগতভাবে এটা একটা স্বাভাবিক তাড়না। এ সময় কোন সম্ভ্রান্ত ঘরের সুন্দরী কোন রমণী ব্যভিচারে লিপ্ত হবার প্রস্তাব করলে শুধুমাত্র আল¬াহর ভয়েই তা থেকে বিরত থাকা যায়।
এভাবে চরিত্রের হেফাজত করলে তবেই আরশের ছায়ায় স্থান লাভ করা যাবে।
কোরআন ঃ
অর্থ ঃ “আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়োনা। নিশ্চয়ই এটা অশ¬ীল কাজ এবং অসৎ পন্থা।” (বনী ইসরাঈল-৩২)
অর্থ ঃ “লজ্জাহীনতার যত পন্থা আছে তার নিকটেও যেওনা, তা প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক।” (আনআম-১৫২)
বিবাহের মাধ্যমে বৈধ পন্থায় যৌন চাহিদা মেটানো ইসলামের নির্দেশ।
অর্থ ঃ এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না। (মুমিনুন-৫-৬)
৭. গোপনে দান করা ঃ দান করতে আল¬াহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। মুনাফিকুনের ১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
“আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে খরচ করো মৃত্যু আমার আগেই।”
“তোমরা কিছুতেই কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষন না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তুগুলিকে আল¬াহর পথে ব্যয় করবে।” (আল ইমরান-৯২)
আল¬াহর সন্তুষ্টি অর্জনই হবে দান করার মূল লক্ষ্য। মনে অহংকার আসতে পারে এ ধরনের ভীতির কারণই হলো দানের এ পদ্ধতি উলে¬খ করার কারণ।”
হাদীস ঃ “আল¬াহ তোমাদের সৌন্দর্য ও সম্পদের দিকে লক্ষ্য করেননা বরং তোমাদের অন্তকরণ ও কাজের দিকে লক্ষ্য করেন।”

-ঃ শিক্ষা ঃ-
১. সর্ব পর্যায়ে স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কোরআনে বর্ণিত নেতার কাজ প্রতিষ্ঠার যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের হাতে নেতৃত্ব দিতে হবে।
২. যৌবনের সকল চেষ্টা সামর্থ আল¬াহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে ব্যয় করতে হবে।
৩. সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে নামায কায়েম করতে হবে ও নামাযের পূর্ণ পাবন্দী করতে হবে।
৪. সমস্ত তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য হবে আল¬াহর সন্তুষ্টি অর্জন।
যাবতীয় চেষ্টার পর জ্ঞাত বা অজ্ঞাত দোষত্র“টির জন্য ক্ষমা চেয়ে আল¬াহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

দারসুল হাদিস: দুনিয়ায় ঈমানদারের অবস্থা

দারসুল হাদিস
দুনিয়ায় ঈমানদারের অবস্থা

সরল অনুবাদ : হজরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম (সা) ইরশাদ করেছেন : দুনিয়া ঈমানদারের বন্দিশালা এবং কাফিরের জান্নাত (সহীহ আল মুসলিম)
বর্ণনাকারীর পরিচয়
হজরত আবু হুরাইরা (রা) হলেন সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী। আবু হুরাইরা তার উপাধি। ইসলাম গ্রহণের আগে তার নাম ছিল ‘আবদে শামস’ বা আবদে ওমর। রাসূলে আকরাম (সা) সে নাম পরিবর্তন করে ‘আব্দুর রহমান’ রাখেন। ইসলাম গ্রহণের পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মতো তিনি নবী (সা) এর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। সর্বদা মসজিদে নববিতে পড়ে থাকতেন। তিনি ছিলেন আসহাবে সুফফাদের অন্যতম একজন। তিনি সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী হওয়ায় অনেকে তাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাই তিনি বলেন, ‘তোমরা হয়তো মনে করছো আমি খুব বেশি হাদিস বর্ণনা করি। আমি ছিলাম হতদরিদ্র। পেটে পাথর বেঁধে সর্বদা রাসূলে আকরাম (সা) এর সাহচর্যে কাটাতাম। আর মুহাজিররা ব্যস্ত থাকতো ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আর আনসারগণ ব্যস্ত থাকতো ধনসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে।’
হজরত আবু হুরাইরা (রা) ছিলেন জ্ঞানের সাগর। মহানবী (সা) নিজেই বলেছেন : ‘আবু হুরাইরা জ্ঞানের আধার।’ (বুখারী) হাদিসের এই জীবন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র হিজরি ৫৯ সনে ৭৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা মোট ৫ হাজার ৩৭৪টি।
হাদিসটির গুরুত্ব
মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা। দুনিয়া মানুষের কর্মক্ষেত্র। এখানে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক জীবন পরিচলনা করতে হবে। যাদের জীবন আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক হবে, তারাই মুমিনের মর্যাদা লাভ করবেন। আর যারা ইচ্ছেমতো আল্লাহর নির্দেশের সীমা অতিক্রম করে জীবন পরিচালনা করবে তারাই কাফির। সে জীবনদর্শনের দিকে ইঙ্গিত করেই এ হাদিসের বক্তব্য। প্রকৃতপক্ষে একজন মুমিন ও কাফিরের জীবনের স্বরূপ উন্মোচন করা হয়েছে উল্লিখিত হাদিসটিতে।
ব্যাখ্যা
বন্দিশালায় কোন কয়েদি পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। বন্দিজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কর্তৃপক্ষের আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ আইন লঙ্ঘন করার অধিকার কোন বন্দীর নেই। যখন যে আদেশ তাকে দেয়া হয় সে আদেশ মানতে সে বাধ্য। বন্দী কখনো এ কথা বলতে পারে না যে, আমি এ আদেশ মানবো, অমুক আদেশ মানবো না। দুনিয়ার জীবনও মুমিনের জন্য বন্দিশালার মতো। কারণ এখানে সে পূর্ণ স্বাধীন নয়। মন যা চায় তা সে করতে পারে না। দুনিয়ার প্রেমে প্রেমাসক্ত হয়ে মুমিন আল্লাহর হুকুমের বিপরীত কোন হুকুম পালন করতে পারে না।
অপর দিকে জান্নাতের বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে কোন কাজ ও তৎপরতা নিয়ন্ত্রিত নয়। ইচ্ছেমতো জীবন যাপন করতে পারবে। জান্নাতিদের কোন ইচ্ছে অপূর্ণ থাকবে না। সর্বত্র সুখ আর সুখ। জান্নাতের আরাম আয়েশ ছেড়ে জান্নাতিগণ কখনো বাইরে যেতে চাইবে না। কোটি কোটি বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও কোন জান্নাতবাসী হাঁফিয়ে উঠবে না।
যদিও পৃথিবী কখনো জান্নাতের সাথে তুলনীয় হতে পারে না। তবুও পৃথিবীকে কাফিরদের জান্নাত বলার অর্থ হচ্ছে কাফিররা দুনিয়াকে জান্নাত মনে করে। তারা তাদের জীবনকে আল্লাহপ্রদত্ত সীমার বাইরে থেকে ভোগ করতে চায়। তারা দুনিয়ার জীবনকে উপভোগ করার জন্য সম্ভাব্য সকল পথ অবলম্বন করে থাকে। প্রবৃত্তির হুকুম ও চাহিদা অনুযায়ী জীবন যাপন করে। তারা আখিরাতে বিশ্বাসী না হওয়ার কারণে দুনিয়ার জীবনকে সুন্দর ও উপভোগ্য করার জন্য জীবনপাত করে। অথচ একদিন তাকে এ সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে খালি হাতে মুসাফিরের মতো বিদায় নিয়ে চলে যেতে হবে। বন্দীগণ যেমন বন্দিশালাকে নিজের গৃহ মনে করে না, নিজ গৃহে ফেরার জন্য সর্বদা ব্যাকুল থাকে। তেমনি মুমিনগণ পৃথিবীকে আবাসস্থল মনে করে না। তাই দুনিয়ার জীবনে আরাম আয়েশ ও ভোগ বিলাসের মোহ তার থাকে না। বরং তার মন চির সুখের জান্নাতে যেতে ব্যাকুল থাকে। এ জন্য সে তা লাভ করার জন্য কঠিন প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকে এবং সকল বিপদ আপদ দুঃখ-কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করে নেয়। আল্লাহ বলেন, ‘‘বস্তুত আমরা মানুষকে কঠোর কষ্ট ও শ্রমের মধ্যে সৃষ্টি করেছি।” (সুরা বালাদ : ৮)
সুতরাং এ দুনিয়া মানুষের জন্য আরাম আয়েশের জায়গা নয় বরং কঠোর শ্রম ও কষ্টের জায়গা। পৃথিবীর সকল সুখ, আরাম আয়েশ একত্র করলেও আখিরাতের তুলনায় খুবই নগণ্য। রাসূলে আকরাম (সা) বলেন :
আল্লাহর কসম! আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার দৃষ্টান্ত হলো তোমাদের কোন ব্যক্তি সমুদ্রের মধ্যে তার আঙুল ডুবিয়ে দেখল যে, তাতে কত পানি লেগে এসেছে। (মুসলিম)
অন্য হাদিসে আছে যে, গোটা পৃথিবীর মূল্যও আল্লাহর নিকট মাছির পালকের তুল্য নয়। তাই এই নগণ্য বস্তুর পেছনে যারা ব্যস্ত থাকে তারা বোকা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যদি পরকালের অনন্ত সুখ-সম্ভার চির-বসন্ত বিরাজিত জান্নাত কেউ পেতে চায় তবে তাকে কঠোর পরিশ্রমের পথই বেছে নিতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।
শিক্ষাবলি
১. দুনিয়ার সুখ আসল ও চিরস্থায়ী নয়।
২. পৃথিবী মানুষের স্থায়ী নিবাস নয় সাময়িক পরীক্ষাকেন্দ্র মাত্র।
৩. পরকালের বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের কারণেই মানুষের কৃতকর্মে দুটো ধারার সৃষ্টি হয়। ইতিবাচক ও অপরটি নেতিবাচক।
৪. ইতিবাচক পথের শেষ মানজিল জান্নাত এবং নেতিবাচক পথের শেষ মানজিল জাহান্নাম।
তথ্যসূত্র :
১. সহীহ আল মুসলিম।
২. মিশকাতুল মাসাবিহ।
৩. মা’আরিফুল কুরআন : মুফতি মুহাম্মাদ শফী।